তালেবানের নয়া উত্থানে
দেশের জঙ্গিবাদ উত্থানের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে
জাইম ফারাজী

আফগানিস্তানে তালেবানের বিজয়ে বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদ  কি বাড়তে পারে ! এই উদ্বেগের কারণ আফগান যুদ্ধ এবং সিরিয়ায় আইএস-এর পক্ষে যুদ্ধে বাংলাদেশের কিছু লোকের অংশ নিয়েছিল। আশির দশকে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান দখল করে তখন বাংলাদেশ থেকে অনেক তরুণ আফগানিস্তানে গিয়ে মুজাহেদিন বাহিনীর পক্ষে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। সে সময়ই কিছু তরুণ তাবলীগ জামাতের সাথে পাকিস্তান হয়ে সীমান্ত দিয়ে আফগানিস্তানের পৌঁছে।
আশির দশকে বাংলাদেশের অনেক যুবক যারা আফগানিস্তানে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের অনেকে দেশে ফিরে জঙ্গি তৎপরতায় জড়িয়ে পড়েছিলেন বলে পুলিশি রিপোর্ট জানা যায়।
 মূলত আফগানিস্তান থেকেই জঙ্গি তৎপরতা বাংলাদেশে এসেছে এবং সেজন্য সেখানে আবার তালেবানের উত্থানে নতুন করে জঙ্গি তৎপরতা বৃদ্ধির আশংকা রয়েছে।
বাংলাদেশে ইসলাম নিয়ে উগ্রবাদ না থাকলেও। আফগান ফেরতরা প্রথমে মুসলিম জাগ্রত বাহিনী গঠন করেছিল। আফগানিস্তান থেকে আশি এবং নব্বইয়ের দশকে যারা ফেরত এসেছিল, তাদের সঠিক তালিকাও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে না থাকায় দেশেরশৃঙ্খলা বাহিনী আনেকটা অন্ধকারে। তাই আফগান ফেরতদের ব্যাপারে আবার নতুন করে নজর দেয়া উচিত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
আফগানিস্তান থেকে আশির দশকে যারা ফেরত এসেছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম দু'জন হলেন আব্দুর রহমান এবং মুফতি আব্দুল হান্নান।যাদের নেতৃত্বে জেএমবি এবং হরকাতুল জিহাদ নামের দু'টি জঙ্গি সংগঠনে ১৪জন আফগান ফেরত ছিলেন বলে জানা যায়।জঙ্গি তৎপরতার দায়ে শীর্ষ দু'জনসহ ১৪ জনের ফাঁসি হয়েছে।
এবিষয়ে আরও জানা যায় যে, শুধু আফগানিস্তান নয়, কসোভো যুদ্ধ এবং সিরিয়ায় জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের যুদ্ধেও বাংলাদেশের অনেক যুবক অংশ নিয়েছিল।
আফগানিস্তানের মুজাহেদিনের পরে তালেবানের সাথে বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠনগুলোর যোগাযোগ মূলত আল কায়দা এবং ইসলামিক স্টেটের মাধ্যমে। এখন আল কায়দার কৌশলের ওপরই বাংলাদেশের মাথা চাড়া দেয়া না দেয়ার বিষয় নির্ভর করবে বলে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
এটা সবাই জানেন যে, তালেবানের সাথে সবচেয়ে ভাল সম্পর্ক হলো আল কায়দার। ভারতীয় উপমহাদেশে আল কায়দার যে শাখা আছে, তার সাথে বাংলাদেশের জঙ্গিদের যোগাযোগ আছে বলে জানা যায়।
২০১৪ সালে আল কায়দার একটা মিডিয়া উইং নয় মিনিটের  যে ভিডিও প্রকাশ করে, তাতে আফগানিস্তানের একটি ক্যাম্পে তালেবান এবং আল কায়দার সাথে কয়েকজন বাংলাদেশিকে দেখা গেছে।
আল কায়দা এখন আফগানিস্তানের এই নতুন তালেবান ইস্যু কিভাবে ব্যবহার করবে-তার ওপর নির্ভর করবে বাংলাদেশে জঙ্গি বা ধর্মীয় উগ্রবাদ মাথা চাড়া দেবে কিনা।
১৬ বছর আগে জঙ্গি সংগঠন জেএমবি দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা হামলা চালিয়েছিল।এরপর ভয়াবহ জঙ্গি হামলা ছিল ঢাকার গুলশানে হোলি আটিজান বেকারিতে।
আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অব্যাহত অভিযানে জঙ্গি সংগঠনগুলো দূর্বল হলেও আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থানে বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠনগুলো উজ্জীবিত হতে পারে।জঙ্গিরা দূর্বল হয়ে পড়লেও আফগানিস্তানের প্রেক্ষাপটে এদের নিয়ে নতুন করে চিন্তার বিষয় রয়েছে।
যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সরকারের পুরোনো অবস্থানই তুলে ধরে দাবি করেন, এসব জঙ্গি সংগঠনের বাইরের কোন যোগাযোগ নেই ও এগুলোর সাংগঠনিক শক্তি না থাকায় নতুন কোন সংকট তারা দেখেন না।
আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ তালেবানের হাতে চলে যাওয়ার পর বাংলাদেশে প্রচলিত সব ইসলামপন্থী দল বা সংগঠনে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি করেছে। অনেকে এর বড় কারণ হিসাবে তালেবানের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়কে দেখছেন এবংইসলামপন্থী অনেক দল এবার তালেবানের  যুদ্ধকে আফগানিস্তানের মুক্তিযুদ্ধ হিসাবে বিবেচনা করে তাতে সমর্থন দিয়েছে। তালেবান যদি শরীয়া আইন প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে বাংলাদেশে যারা এই আইন কায়েম করতে চায়, তারা উৎসাহ পাবে।
বিভিন্ন সময় বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদ যে মাথা চাড়া দিয়েছে, তার পেছনে উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর নিজেদের শক্ত ভিত্তি ছিল বলে অনেকে মনে করেন।তবে বিভিন্ন সময় রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় প্রশ্রয় দেয়ার বিষয় নিয়েও অনেক বিতর্ক হয়েছে।
সরকার এবং রাষ্ট্র থেকে জঙ্গি তৎপরতায় প্রশ্রয় না  দিলেও দেশের মানুষের একটা অংশে ধর্ম নিয়ে উগ্রতা বেড়েছে এবং সেটা এখন আরও বাড়তে পারে।
সময়ের সাথে সাথে বিশ্ব রাজনীতিতে পরিবর্তন এসেছে,বাংলাদেশের ইসলামপন্থী দলগুলোও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টিয়েছে বলে আনেকে মনে করেন।এসব দলের বেশিরভাগেরই এখন সশস্ত্র বা চরম উগ্র অবস্থান নেয়ার মনোভাব নেই।যদিও এখনও তাদের কট্টর মনোভাব আছে।
অন্যদিকে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলো দূর্বল হলেও আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থানে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তাই এবিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখা জরুরী বলে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
 
 

সর্বশেষ সংবাদ