রাজনীতিক জিয়ার উত্থান
বিএনপির জন্ম জন্মান্তর(৩)
বিশেষ প্রতিবেদক

জেনারেল  জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালের ১১ই নভেম্বর জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া প্রথম ভাষণে বলেছিলেন, ‘আমি একজন সৈনিক, রাজনীতিবিদ নই।
১৯৭৭সালের ২২শে এপ্রিল জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বলেন যে ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের ভোটের ভিত্তিতে সাধারন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় সংসদের সদস্যদের নির্বাচিত করবার লক্ষ্যে। তিনি ও তার সরকার গণতন্ত্রে বিশ্বাসী এবং জনগণের মতামতের ভিত্তিতে যথাসময়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
 
প্রেসিডেন্টের পদ গ্রহন করবার পরে তিনি বেশ কিছু পদক্ষেপ নিলেন তার তার মধ্যে ছিলো প্রেসিডেন্সিয়াল রেফারেন্ডাম বা গণভোট ও প্রেসিডেনশিয়াল ইলেকশনের ব্যবস্থা করা। এরপর একটি রাজনৈতিক দল গঠন ও সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। 
জিয়াউর রহমান বিচক্ষণতার সাথে তার রাজনৈতিক লক্ষাভিসারী পথে আগ্রসর হন। তিনি তার সরকারের উপদেষ্টামন্ডলীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মুহাম্মদ শামসুল হক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য সৈয়দ আলী আহসান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা প্রশাসন ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক মোজাফফর আহমদএর মতো গুণী ও শিক্ষাবিদের স্থান দেন।
জেনারেল জিয়াউর ইতোমধ্যে ভাসানী-ন্যাপের সভাপতি মশিউর রহমান যাদু মিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন দলের রাজনীতিবিদদের যোগাযোগ শুরু করেন। প্রথম দিকে তিনি যাঁদের সাথে কথাবার্তা বলা শুরু করেন।
 
জেনালের জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্বগ্রহন করারপর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আস্থা গণভোট ১৯৭৭-এর আয়োজন করেন।
৩০শে মে ১৯৭৭ সালে এই আস্থা গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এতে ভোটারদের কাছে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনি কি রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের (বীর উত্তম) প্রতি এবং তার দ্বারা গৃহীত নীতি ও কার্যক্রমের প্রতি আস্থাশীল ? ভোটের ফলাফল ছিল, ৯৮.৯% হ্যাঁ । মোট ভোট সংগৃহীত হয়েছিল, ৮৮.১%।
জিয়াউর রহমান আস্থা গণভোট করেও তৃপ্ত ছিলেন না। তিনি সরাসরি প্রতিদ্বণ্ডিতামূলক নির্বাচন করে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হতে আগ্রহী ছিলেন। আর একন্য প্রয়োজন একটি রাজনৈতিক প্লাটফর্মের। আর এলক্ষ্যে ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে তিনি উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে প্রধান করে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) প্রতিষ্ঠা করেন। এবং প্রেসিডেনশিয়াল ইলেকশনের ব্যবস্থা করেন।
জেনারেল জিয়া প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হবার পর ধীরে ধীরে নিজের একটি নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন।
এসময় জিয়াউর রহমান তার রাজনৈতিক চেতনার বিকাশের লক্ষ্যে একটা ঘোষণা-পত্র বা কর্মসূচী তৈরী করেন। সার্বিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপর জোর দিয়ে ১৯৭৭ সালের ২২শে মে আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে জেনারেল জিয়া ১৯দফা কর্মসূচী ঘোষণা করেন।
 
জিয়া রাজনৈতিক দল তৈরির আগেই একটি রাজনৈতিক ফ্রন্ট গঠনের চিন্তা করেন। এলক্ষে তিনি সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে একটি রাজনৈতিক জোট তৈরির বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে দেখেন। 
এলক্ষ্যে তিনি ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উপরাষ্ট্রপতি  বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল বা 'জাগদল' নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল তৈরির ঘোষণা দেন। 
 
এরপর ১৯৭৮ সালের ১ মে জিয়াউর রহমানকে চেয়ারম্যান করে আনুষ্ঠানিকভাবে 'জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট' গঠন করা হয়। 
১৯৭৮ সালের ২৮শে এপ্রিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা করা হয়। 
নির্বাচনের কিছুদিন আগে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো প্রধান দুইটি জোটে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করে। এদের একটি ছিলো জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট কিংবা জোট এবং আরেকটি গণতান্ত্রিক ঐক্য জোট বা ডেমোক্রেটীক ইউনাইটেড ফ্রন্ট। জাতীয়তাবাদী জোট জিয়াউর রহমানকে এবং গণতান্ত্রিক ঐক্য জোট জেনারেল ওসমানীকে প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন দেয়। জেনারেল জিয়ার জাগদল জাতীয়তাবাদী জোটের প্রধান শরীক ছিলো।
৩রা জুন, ১৯৭৮ সালের নির্বাচনে চূড়ান্ত ফলাফলে জেনারেল জিয়া বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। জে. জিয়া এ নির্বাচনে ৭৬% ভোট পান এবং জে. ওসমানী পেলেন ২১% ভোট। ভোটার উপস্থিতি ছিলো ৫৪% । জে. ওসমানী স্বীকার করে নেন যে ভোটগ্রহণ মোটামুটি সুষ্ঠু হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও এ নির্বাচনকে গ্রহনযোগ্য বলে মত দিলেন। এভাবেই জেনারেল জিয়াউর রহমান ৫ বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
জে. জিয়া প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়ে নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয়ের দিকে অগ্রসর হন।
এসময় মশিউর রহমান যাদু মিয়া বিশেষ ভূমিকা রাখেন। জিয়াউর রহমান পরে তাকে তার মন্ত্রীসভায় 'সিনিয়র মিনিস্টার' নিয়োগ করেন।
আওয়ামী লীগ বিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গ্রুপের সবাই জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টে ছিলেন।
তবে নানান মত ও পথের এ ফ্রন্ট নিয়ে জিয়াউর রহমান আস্বস্ত ছিলেন না। তিনি সমমনা লোকদের নিয়ে আলাদা দল তৈরির সিদ্ধান্ত নিলেন।
দল তৈরির জন্য যাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছিল, তাঁদের অন্যতম ছিলেন তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী। তিনি দলের নাম 'জাস্টিস পার্টি' রাখার প্রস্তাব করেন। নামটি কিছুটা পানসে হওয়ায় সেটি গ্রহণযোগ্য হয়নি। দলের নামের সাথে জাতীয়তাবাদী শব্দটা থাকা জরুরী ছিল বলে শেষমেশ স্থির হয়, দলের নাম হবে 'বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল'। জিয়াউর রহমান নিজেই দলের নামকরণ করেন।
১৯৭৮ সালের ২৮ আগষ্ট 'জাগদল' বিলুপ্তির ঘোষণা দেওয়া হয়। এবং ১লা সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা রেস্তোরাঁ প্রাঙ্গনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জিয়াউর রহমান বিএনপির প্রধান হিসেবে দলের নাম, গঠনতন্ত্র ও কর্মসূচী আনুষ্ঠানিক দল ঘোষণা করেন।
বিএনপির গঠনতন্ত্র তৈরির প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন নয়জন। তাদের মধ্যে জিয়াউর রহমান ছাড়াও যুক্ত ছিলেন বিচারপতি সাত্তার, ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা,ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী প্রমূখ। (চলবে)
 

বিশেষ প্রতিবেদন এর আরো খবর