জিয়ার রাজনীতির শুরু:সেনা-নায়ক থেকে জন-নায়ক
বিএনপির জন্ম জন্মান্তর(২)
বিশেষ প্রতিবেদক

একথা সবারই জানা দেশের এক ক্রান্তিকাল বা যুগসন্ধিক্ষণে বিএনপি বা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের জন্ম হয়।দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। একজন সেনাকর্তা হয়ে রাজনীতিতে আসা ও রাজনৈতিক দল তৈরী করে দেশের রাজনীতি গতিধারা বদলে দেওয়ায় আনেকেই তার সমালোচনা-মূখর। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে যে, জিয়ার রাজনীতি শুরু হয় ২৬শে মার্চ। যখন তিনি দেশের বিভিন্ন যায়গায় পাকিস্তানী সেনাদের হত্যাযজ্ঞর কথা শুনে বলে ওঠেন,“ উই রিভোল্ট- আমরা বিদ্রোহ করলাম।”  
একজন সেনাকর্তা বিদ্রোহ করতে পারেন না। যদি করেন, তবে তিনি আর সেনা সদস্য থাকেন না। তিনি পিলিটিশিয়ান হয়ে যান। একজন সেনা নায়ক শুধু অর্ডার ফলো করেন। কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেবার আধিকার শুধুমাত্র রাজনীতিকের।
 
২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে প্রথমে নিজের নামে ও পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে মেজর জিয়া বাংলাদেশের যে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন তা ছিলো এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। বিভিন্ন বিদেশী গণমাধ্যম তা প্রচার করে। এটা কোনো সেনাকর্মকর্তার কাজ নয়। তিনি বরং একজন রাজনীতিকের দায়িত্বিই পালন করেছেন।
 
জিয়া জানতেন,যদি স্বাধীনতার সংগ্রাম ব্যর্থ হয় এবং তিনি পাকিস্তানী বাহিনীর কাছে ধরা পড়েন তাহলে সেনাবাহিনীর শৃঙ্লা ভঙ্গের দায়ে তার একমাত্র শাস্তি ছিলো ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড ।
মেজর জিয়া যখন কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ঘোষণা করেন,“ আমি মেজর জিয়া বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর সামরিক সর্বাধিনায়ক রূপে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।” তখন তিনি আর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্য নন। তাছাড়া তিনি তখন আর শুধুই সেনানায়ক নন,জননায়কে পরিবর্তিত হয়ে যান।
মুলত ২৬শে মার্চ জিয়া যে রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেন তার সম্পূরক ও সর্বাত্মক সিদ্ধান্তই ছিলো ২৭শে মার্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা।
 
মেজর জিয়ার সাফল্যের মুকুটে অনেক স্বর্ণপালক থাকলেও পরবর্তীতে নব্যস্বাধীন বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও অবহেলর শিকার হন তিনি। কোর্সমেট হলেও পাকিস্তানী সেনবাহিনীতে মেজর জিয়া ছিলেন মেজর শফিউল্লার সিনিয়র। এছাড়াও বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেবার মতো তার আরও এক গৌরবময় আভিজ্ঞতাও ছিলো। এছাড়াও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম ব্রিগেড “জেড-ফোর্স”  গঠন ও এর নেতৃত্ব দেবার আভিজ্ঞতাও তার ছিলো। তারপরও মেজর জিয়াকে ডিঙিয়ে মেজর শফিউল্লাহকে সেনাপ্রধান বানালেও মেজর জিয়া  বিনা বাক্যব্যয়ে উপ-সেনাপ্রধানের দায়িত্ব মেনে নিয়ে পেশদারিত্বের প্রমাণ দেন।
 
মেজর জিয়ার  প্রাপ্য  সম্মান তাকে বাংলাদেশ দেয়নি। বরং তাকে পাকিস্তানী অনুচর,স্বাধীনতা বিরোধী বা বঙ্গবন্ধু’র খুণের ষড়যন্ত্রকারী হিসেবেই প্রমাণের চেষ্টা করে থাকে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল ! অথচ বাস্তবতা হচ্ছে যে,তিনি বারবার বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠের আনহুত খেলোয়াড় হয়ে রাষ্ট্রের পক্ষে কাঙ্খিত গোল দিয়েছেন।
 
১৯৭২ সালে ১০ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে যুদ্ধবিধ্বস্ত নতুন রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেন। কিন্তু তার আশেপাশের বুভুক্ষু কিছু নেতাকর্মী চাটার দল,চোরের দল ও দেশের অনভিজ্ঞ আমলাতন্ত্র,পুলিশ প্রশাসন ও পরবর্তীতে তার সঙ্গত্যাগী তরুণদের নেতৃত্বে গঠিত জাসদের কারণে দেশে আরাজকতা শুরু হয়। ৭১ পরবর্তী অরাজকতা, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উর্ধগতিতে নাভিশ্বাস ওঠে জনগণের। ১৯৭৪ সালে শুরু হয় চরম দুর্ভিক্ষ !
এমন সময় দিশাহারা শেখ সাহেব যিনি আজীবন গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছেন তিনি কিছু হটকারী বাম নেতার পরমর্শে সব দল নিষিদ্ধ করে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের আদলে একদলীয় বাকশাল তৈরী করেন। 
১৯৭৫ সালে এমন অস্থিতিশীল, অরাজক অবস্থার প্রেক্ষাপটে একদল বিক্ষুব্দ বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সপরিবার নির্মমভাবে নিহত হন। 
 
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সপরিবার নির্মমভাবে নিহত হওয়ায় দেশে যে অস্থিতশীল অবস্থার  তৈরী হয়েছিলো তা জেনারেলর জিয়া শক্তহাতে কন্ট্রোল করতে পেরেছিলেন। এমনটা যদি সম্ভব না হতো তাহলে বাংলাদেশ বিদেশী শক্তির ক্রীড়নকে পরিণত হতো।
 
মূলত সেদিন শেখ সাহেবকে রক্ষার দায়িত্ব যাদের ছিলো,তারা কেউ এগিয়ে আসেনি !
বঙ্গবন্ধুর বাড়ী আক্রান্ত হওয়ার প্রায় এক ঘন্টা পর তিনি ঘাতকের নির্মম বুলেটে নিহত হন ! তিনি বিভিন্ন জনকে ডেকে সাহায্য চান, কিন্তু কেউ আসেনি !
 
রক্ষীবাহিনীর হেড-কোয়ার্টার থেকে তাঁর বাড়ী মাত্র ১০ মিনিটের দূরত্বে আর সেনাবাহিনীর হেড-কোয়ার্টার থেকে মাত্র ১৫ মিনিটের দূরত্বে !
রক্ষীবাহিনী প্রধানের অনুপস্থিতিতে দুই উপ-পরিচালককে চালাতে ব্যর্থ হন রক্ষীবাহিনীর রাজনৈতিক প্রধান তোফায়েল আহমেদ। তিনি বঙ্গবন্ধুর ফোন পেয়েও প্রাণভয়ে ভীত হয়ে রক্ষীবাহিনীকে কোন নির্দেশ না দিয়েই পাশের আব্দুর রাজ্জাকের বাসায় যান। এ্ররপর দুজনে লুঙ্গি-গেঞ্জি পড়া অবস্থাতেই নদী ওপারে  পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেন। পরে রক্ষীবাহিনীর হেড-কোয়ার্টারের এসে নিরাপত্তার জন্য পুলিশ সুপারের মাধ্যমে জেলে ঢোকেন।
বঙ্গবন্ধুর ফোন পেয়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ কার্যত  কোনো এ্যাকশনেই যাননি !
ঢাকা সেনা নিবাসে ‘৪৬ পদাতিক ব্রিগেড’ হলো ইডিপেন্ডেন্ট স্ট্যাণ্ডবাই ব্রিগেড। শফিউল্লাহ এই ব্রিগেডকে সরাসরি আদেশ দিতে পারতেন কিন্তু তিনি তা দেননি !
বঙ্গবন্ধুভক্ত ব্রিগেডিয়ার শাফায়াৎ জামিল ছিলেন ৪৬ পদাতিক ব্রিগেডের অধিনায়ক। ২০ মিনিটের  মধ্যে এই বাহিনী ৩২ নম্বরে পৌঁছতে পারতো।
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ পেয়েও এই দুইজন সেই আদেশ পালন না করার কোনই শাস্তি পাননি ! বরং তাদের এমপি-মন্ত্রী বানিয়ে পুরস্কৃত করা হয় !
ইতিহাস তৈরী করা যায়না।ঘটমান সত্যই ইতিহাস।ইতিহাসের কাঠগড়ায় একদিন এই দুইজনের বিচার হবে, এতে সন্দেহ নাই। অথচ কিছু স্বার্থান্বেষী মহল জেনারেল জিয়াকে নিয়ে হীন উদ্যেশ্য চরিতার্থ করতে নানান গল্পকাহিনী শুনয়ে থাকে।
 
 
বঙ্গবন্ধু নিহত হবার পরে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট বন্ধু, তার স্ত্রীর ধর্মভাই ও তার পরিবারের উপাদেয় খাদ্য  সরবরাহকারী খন্দকার মোস্তাক নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট এই সহকর্মী আওয়ামী লগের সিনিয়র নেতাদের নিয়ে সরকার গঠন করেন। এবং বঙ্গবন্ধুর বিচারের বিরুদ্ধে ইনডেমিনিটি জারি করেন।
 
তৎকালে নেবাহিনীতে শৃঙ্খলা বলতে কিছুই ছিলো না। তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খরা ফিরিয়ে আনতে আপারগ ছিলেন। তখন খন্দকার মোস্তাক জেনারেল ওসমানীর পরামর্শে মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ স্থলে মেজর জেনারেল জিয়াইর রহমানকে সেনাপ্রধান হিসেবে নিযোগ  দেন।
এই নিয়োগের এক সুদূর প্রসারী আধ্যায়ের সুচক ছিলো, তা পরবর্তী ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহে প্রমাণিত হয়।
এমন এক ক্রান্তিকালে বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের ভিতর দিয়ে ইতিহাসের আবারও পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন জেনারেল জিয়া।
১৮৭১ সালের ২৭ মার্চ মেজর জিয়া কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ঘোষণা করছিলেন,“ আমি মেজর জিয়া ৃবাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।”
 
আবারও তার কণ্ঠ ভেসে আসে ইথারে এবার শাহবাগ বেতার ভবন থেকে ১৯৭৫ সালের ১১ই নভেম্বর জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া তার প্রথম ভাষণে।
তিনি বলেন “ আমি একজন সৈনিক, রাজনীতিবিদ নই। আমি এবং আমার সরকার পূর্নরুপে গনতন্ত্রে বিশ্বাসী এবং জনগণের মতামতের ভিত্তিতে যথাসময়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।”
 
১৯৭৫ পরবর্তীতে দেশের রাজনীতিতে শূন্যতা বিরাজ করছিলো। জেনারেল জিয়া জনআকাঙ্খা বুঝেছিলেন যে, তারা নতুন কিছু চায়। বহুদলীয় গণতন্ত্রের ক্ষেত্র তৈরীর জন্য প্রযোজনীয় রাজনৈতিক দলের অভাব ছিলো। বাকশালে রূপান্তরিত লুটেরা প্রধান পেটিবুর্জোয়া আওয়ামী লীগ,নির্বাচনবিমূখ ভাসানী ন্যাপ ও জাসদের পুনরোজ্জীবন করলেও দেশের রাজনীতির শূন্যতা পুরণে যথেষ্ট নয় বিবেচনা করে জেনারেল জিয়া এক নতুন দল গঠনের স্বপ্ন দেখেন। 
২১শে এপ্রিল, ১৯৭৭সিালে প্রেসিডেন্ট ও সাবেক বিচারপতি সায়েম অসুস্থ্যতার কারনে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে দাড়ালে জেঃ জিয়া বাংলাদেশের সপ্তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বায়িত্বভার গ্রহন করেন। এর আগে ১৯শে নভেম্বর ১৯৭৬ সালে জেঃ জিয়াউর রহমান আবার চীফ মার্শাল ল’ এডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে দ্বায়িত্ব গ্রহন করেন বিচারপতি সায়েমের পরিবর্তে। ২১শে এপ্রিল  থেকে একইসাথে প্রেসিডেন্ট, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব বুঝে নেন তিনি।
 
প্রেসিডেন্টের পদ গ্রহন করবার পরে জেঃ জিয়া বেশ কিছু পদক্ষেপ প্রেসিডেন্সিয়াল রেফারেন্ডাম (গণভোট) ও প্রেসিডেনশিয়াল ইলেকশনের।(চলবে)
 

সর্বশেষ সংবাদ

বিশেষ প্রতিবেদন এর আরো খবর