ক্রমেই খুলে পড়ছে তালেবানের নতুন মূখোশ
জাইম ফারাজী

কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেবার পর থেকেই তালেবান নেতারা বলে আসছিলেন যে এই তালেবান সেই ২০ বছর আগের তালেবান নয়। কিন্তু যেদিন কাবুলসহ অন্যান্য শহরে আফগান নারীরা প্ল্যাকার্ড, ব্যানার নিয়ে তাদের অধিকার, সরকার ও সমাজে তাদের বড় ভূমিকার দাবিতে বিক্ষোভ দেখানো শুরু করলেন, তখনই বোঝা গেল তালেবানরা আসলে তেমন বদলায়নি।
তালেবানরা নারীদের বিক্ষোভ ভেঙে দিতে ফাঁকা গুলি ছুঁড়েছেই ক্ষান্ত হয়নি, রাইফেলের বাট আর লাঠি দিয়ে বিক্ষোভকারীদের পিটুনি দিয়েছে।
সোশাল মিডিয়ায় কিছু মানুষ প্রবল আগ্রহ নিয়ে এই প্রত্যাশা করেছিলো যে তালেবানের প্রতিশ্রুতি রাখবে কিন্তু তালেবানের প্রতিশ্রুতির ওপর এখন আর ভরসা করতে পারছেনা অনেকেই।
তালেবানরা সবাইকে নিয়ে সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি দিলেও সেটা একেবারেই হয়নি। তালেবানের নেতৃত্বে তাদের পুরনো কাঠামোতেই সরকার গঠন করেছে।
সরকারের সদস্যরা বেশিরভাগই পশতু জাতিগোষ্ঠীর সদস্য। মন্ত্রিসভায় রয়েছেন মাত্র একজন তাজিক এবং একজন হাজারা - তারা দু'জনেই তালেবানের সদস্য। একজন নারীকেও মন্ত্রিসভায় স্থান দেয়া হয়নি,এমনকি উপমন্ত্রীর মর্যাদায়ও কোন নারী নেই।
তালেবানের এই নতুন সরকার গঠিত হয়েছে পুরনো তালেবান নেতা এবং নতুন প্রজন্মের মুল্লাহ্ ও সামরিক অধিনায়কদের নিয়ে।
১৯৯০ এর দশকে তালেবানের যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা ফিরে এসেছেন। আগে তাদের দাড়ির রংকালো ছিলো এখন তাদের দাড়ির রঙ সাদা পার্থক্য এটুকু।
গত ক'মাস ধরে তীব্র লড়াইয়ে যুক্ত ছিলেন এমন ক'জন অধিনায়ক, আর কিছু স্বঘোষিত শান্তি আলোচনাকারী, যারা সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে এটি তালেবানের নতুন সংস্করণ।
বর্তমান কেয়ারটেকার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজুদ্দিন হাক্কানি। যিনি নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় ২০২০ সালে একটি নিবন্ধ লিখে শান্তির ডাক দেন।  অথচ হাক্কানি নেটওয়ার্ককে আফগান বেসামরিক জনগণের ওপর কিছু নৃশংস হামলার জন্য দায়ী করা হয়। তারা এখন তালেবানের সদস্য।
তালেবানের কেয়ারটেকার সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হয়েছেন মুল্লাহ্ ইয়াকুব। তিনি তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা আমির মুল্লাহ্ ওমরের বড় ছেলে। এ যেন নতুন বোতলে পুরনো মদ এর মত আবস্থা।
আফগানিস্তানে গত সোমবার থেকে খুলে দেওয়া হয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। একই ক্লাসে ছেলে ও মেয়ে শিক্ষার্থীরা বসলেও ক্লাসরুমের মাঝখানে পর্দা দিয়ে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। পর্দার এক পাশে ছেলে শিক্ষার্থী এবং অন্যপাশে মেয়ে শিক্ষার্থীরা বসে ক্লাস করেছেন।
তালেবান সরকারের ইংরেজি ভাষার অফিসিয়াল টুইটার অ্যাকাউন্ট, তালিব টাইমস এবং স্থানীয় নিউজ চ্যানেলগুলো টুইটারে এই পর্দা দিয়ে ভাগ করা ক্লাসরুমের ছবি পোস্ট করেছে। সেই ছবিগুলোতে দেখা যাচ্ছে ক্লাসরুমে পুরুষ এবং নারী শিক্ষার্থীরা আলাদা আলাদাভাবে বসে লেকচার শুনছেন। আর ছেলে-মেয়েদের আসনের মাঝে রয়েছে একটি পর্দা, যেন পুরুষ ও নারী শিক্ষার্থীরা পরস্পর পরস্পরকে দেখতে না পায়।
এর আগে তালেবানের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয় এক নির্দেশনায় জানিয়েছিল, আফগানিস্তানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের মুখ ঢাকা নেকাব পরে ক্লাসে আসতে হবে। পুরুষদের সঙ্গে একই ক্লাসে নারীরা বসতে পারবে না। আর নারীদের যদি একান্তই পুরুষদের সঙ্গে ক্লাস করতে হয় তাহলে ক্লাসরুমের মাঝামাঝি পর্দা দিয়ে ভাগ করে দিতে হবে।
নারী শিক্ষার্থীদের ক্লাস অবশ্যই নারী শিক্ষকরা নেবেন বলে নির্দেশনায় জানানো হয়েছে। নারী শিক্ষক না থাকলে সচ্চরিত্রের বয়স্ক পুরুষ শিক্ষকরাও পড়াতে পারেন।
এমনকি নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকা ও বের হওয়ার পথও আলাদা হতে হবে ওই নির্দেশনায় জানানো হয়েছে।
আফগানিস্তানের নারীরা শুধু হিজাব পরে মুখ খোলা রেখেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে অংশ নিতে পারবে বলে এর আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে তালেবান।
২০০১ সালে প্রথম দফায় তালেবানের শাসনের অবসানের পর আফগানিস্তানে ব্যাঙের ছাতার মতো বেসরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল। গত দুই দশকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে আফগান শিক্ষার্থীদের ভর্তির হারও অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে ছাত্রীদের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। চলতি বছরের আগস্ট মাসে তালেবান কাবুল দখলের আগ পর্যন্তও আফগান নারীরা পুরুষদের সঙ্গে পাশাপাশি বসেই ক্লাস করতেন। পুরুষ অধ্যাপকদের লেকচার শুনতেও কোনই  বাধা ছিল না। কিন্তু এসব এখন অতীত।তালেবানরা তাদের মতো করেই সব কিছুর উপর নিয়ন্ত্রণ শুরু করেছে।এবার খেলার প্রসঙ্গে আসা যায়।
আফগানিস্তানে ক্রিকেট সহ চারশ খেলাপুরুষরা খেলতে পারবেন বলে জানালেও নারীরা খেলতে পারবেন,এমন কোনাই ছাড়পত্র কেউ দিচ্ছে না। ।
সাঁতার, ফুটবল, ক্রিকেট, আফগনিস্তানে সব খেলাই খেলতে পারবে পুরুষরা। কিন্তু মেয়েরা? ডিরেক্টর জেনারেল অফ স্পোর্টস বসির আহমেদ রুস্তমজাই এএফপি-কে বলেছেন ''মেয়েদের খেলার ব্যাপারে আমাকে দয়া করে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করবেন না।''
আহমেদ রুস্তমজাই নিজে আগে আফগানিস্তানের কুংফু ও কুস্তি চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। কিন্তু মেয়েদের খেলা নিয়ে তিনি চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করছেন। এব্যাপারে যাবতীয় প্রশ্ন তিনি এড়িয়ে গিয়েছেন।
রুস্তমজাই বলেছেন, ''ছেলেদের খেলার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। তারা যে কোনো খেলাতেই অংশ নিতে পারে। আমরা কোনো খেলাকেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করব না। যদি না সেটা শরিয়া আইনের বিরোধী হয়। আমরা চারশ ধরনের খেলাধুলো অনুমোদন করি।''
তিনি জানিয়েছেন, ফুটবলারদের বা থাই বক্সিং যারা করবেন, তাদের একটু বড় ঝুলের শর্টস পরলেই হবে। শর্টস হাঁটুর নীচে পর্যন্ত থাকলেই হলো।
মেয়েদের খেলা নিয়ে বারবার প্রশ্ন করা হলে তিনি সর্বোচ্চ তালেবান নেতাদর রায়ের অপেক্ষায় আছেন বলে জানান।
গত সপ্তাহে তালেবানের সাংস্কৃতিক কমিশনের উপ প্রধান আহমদুল্লাহ .ওয়াসিক বলেছেন, ''মেয়েদের জন্য খেলা জরুরি নয়। ক্রিকেট খেলতে হলে, তাদের মুখ ও সারা শরীর ঢেকে রাখা সম্ভব নয়।'' 
তবে মেয়েদের ক্রিকেট খেলা নিয়ে তালেবানের উপর চাপ বাড়ছে। কারণ, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিধি হলো, প্রতিটি দেশ যারা পুরুষদের ক্রিকেট খেলে, তাদের মেয়েদের দলও বাধ্যতামূলকভাবে রাখতে হবে।  তাদের টেস্ট ম্যাচ খেলতে হবে। আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্ট আজিজুল্লাহ ফজলি বলেছেন, মেয়েদের ক্রিকেট খেলার ব্যাপারে তিনি এখনো আশাবাদী।
কিন্তু রুস্তমজাই জানিয়ে দিয়েছেন, ''এই বিষয়ে তালেবান শীর্ষ নেতাদের সিদ্ধান্তই শেষ কথা বলবে। তারা যদি বলেন, আমরা মেয়েদের খেলার অনুমতি দিতে পারি, তা হলে দেব। তারা যদি নিষেধ করেন, তাহলে মেয়েরা খেলতে পারবেন না।''
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে,তালেবানরা বিশ্বের কাছে তাদের উদার ভাবভঙ্গি তুলে ধরে সহানুভূতি অর্জনের চেষ্টা করলেও তারা যে তাদের কট্টর অবস্থান থেকে খুব একটা সরবে না তা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়।
 
 

অন্তরালের খবর এর আরো খবর