আফগানিস্তান নিয়ে রাজনীতির অন্তরালে আশাবাদ
জাইম ফারাজী

আফগানিস্তানে তালেবানের বিজয় ঘোষিত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে আফগানিস্তান নিয়ে নতুন নতুন কথা শোনা যাচ্ছে। মার্কিনী নেতৃত্বে যারা ন্যাটো জেটের মাধ্যমে গত ২০ বছর আফগানে দখলদারিত্ব বজায় রেখেছিলো,তারাও নানান কথা বলছেন।
আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ইসলামী শাসকদের প্রত্যাবর্তনের পর বিশ্বের বড় শক্তিগুলো এখন ঠেলাঠেলি করছে কীভাবে দেশটির ওপর প্রভাব খাটানো যায়।
সম্প্রতি ইইউ আফগানিস্তানের সাথে কাজ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। ব্রিটেন ঝেড়ে না কাশলেও নিমরাজি ভাব নিয়ে আফগানিস্তানের পাশে থাকার ইংগিত দিয়েছে।
এমন কি আফগানিস্তানে তালেবান যুগ শুরু হওয়ায় সবচেয়ে আখুশি ভারতও জানাচ্ছে ক্ষীণ সম্পর্ক বজায় রাখা হবে। আর সম্পর্ক না রেখে উপায়ও নেই । কারণ ভারত আফগানিস্তানের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে।
আফগানিস্তানে তালেবানের বিজয়ে সবচেয়ে খুশি হওয়া দেশ গুলোর মধ্যে আছে পাকিস্তান,তুরস্ক,চীন,ইরান, রাশিয়া,দোহা-কাতার এমন সব রাষ্ট্র।
 
আফগানিস্থানের এমন সম্পদ নেই যে তার প্রতি সে কারণে বিশ্বে বিভিন্ন দেশ আগ্রহী হবে। তবে আফগানিস্তানের ভূরাজনৈতিক অবস্থানের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আফগানিস্তানের বিষয়ে যথেষ্ট আগ্রহী।
আফগানিস্তানে তালেবানের দখলদারিত্ব শুরু হওয়ার পর দেশটি থেকে বিভিন্ন দেশ তাদের দূতাবাস সরিয়ে নেওয়ায় তালেবানের বর্তমান প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা অনেক দেশের জন্য কঠিন হয়ে পরেছে। এই আবস্থায় সাম্প্রতিক সময়ে আরব ও মুসলিম বিশ্বের দুটি দেশ তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী এবং সহায়তাকারী হিসেবে সামনে এসেছে- কাতার এবং তুরস্কর নাম।
যেসব দেশ আফগানিস্তান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, তাদেরকে অনেকটা বাঁচিয়ে দিয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের ছোট্ট গ্যাস সম্পদে সমৃদ্ধ দেশ কাতারের কর্মকর্তারা।
কাতারের কোন না কোন ধরনের সাহায্য ছাড়া কোন দেশই আফগানিস্তানে বড় কোন উদ্ধার অভিযান চালাতে পারতো না বলে জানিয়েছেন অনেক পর্যবেক্ষক। তালেবানের সাথে মধ্যস্থতা করতে কাতার এসময় বড় ভূমিকা রেখে চলেছে। এই সাফল্য আসলে আফগানিস্তান সংকটে জড়িত পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে কাতারকে এক গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে।
পশ্চিমা দেশগুলো যখন কাবুল ছেড়ে পালাচ্ছিল, তখন কাতারের এসব যোগাযোগের কূটনৈতিক মূল্য বহুগুণ বেড়ে যায়। এবং কাতার এক বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে।
মধ্যপ্রাচ্যের  ইসলামী আন্দোলনগুলোর সঙ্গে কাতার এবং তুরস্ক- উভয় দেশেরই ঘনিষ্ঠতার আভিযোগ বেশ পুরনো। এ নিয়ে মিশর, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে তাদের প্রায়শই উত্তেজনা তৈরি হয়। এই তিনটি দেশ আবার ইসলামী আন্দোলনকে তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি বলে মনে করে থাকে।
 
তালেবান যেভাবে আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ফিরে এসেছে, তা আসলে রাজনৈতিক ইসলামের পুনরুত্থান। সরকার ব্যবস্থা এবং সমাজকে এরা ইসলামী আইন অনুযায়ী পুনর্গঠন করতে চায়। 
১৯৯০ এর দশকে তালেবান যখন প্রথম আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ছিল, তখন মাত্র তিনটি দেশের সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল। দেশগুলো হচ্ছে পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত।
২০০১ সালের নাইন-এলিভেন হামলার পর সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেলেও সৌদি আরবের কিছু ব্যক্তির তরফ থেকে গোপনে আরও বহু বছর ধরে তালেবানের কাছে অর্থ সাহায্য গেছে বলে জানা যায়।
প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যখন আফগানিস্তানের যুদ্ধ শেষ করতে চাইছিলেন, তখন কাতার ২০১১ সাল হতে তালেবান নেতাদের জন্য এক সম্মেলনের আয়োজন করেছিল।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমলে গত বছর দোহা শান্তি আলোচনায় শেষ পর্যন্ত যে সমঝোতা হয়, তাতে এ বছরের মে মাস নাগাদ মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের কথা ছিল। তবে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন দায়িত্ব নেয়ার পর এই সময়সীমা বাড়িয়ে এবছরের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত করেন।
তুরস্কের সঙ্গে আফগানিস্তানের ঐতিহাসিক এবং জাতিগত সম্পর্ক রয়েছে। তুরস্ক একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, যারা নেটোর সদস্য। নেটো জোটের সদস্য হিসেবে আফগানিস্তানে তাদের সেনাদলও ছিল।
ইতোমধ্যে তুরস্ক তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন কিছু মিলিশিয়া গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা গোয়েন্দা সম্পর্কও গড়ে তুলেছিল। তুরস্ক একই সঙ্গে আফগানিস্তানের প্রতিবেশী পাকিস্তানেরও মিত্র, যেখানকার মাদ্রাসাগুলো হতে প্রথম তালেবানের উত্থান ঘটেছে।
 
কাবুল বিমানবন্দরে যখন চরম বিশৃঙ্খলা,তখন তুরস্কের কর্মকর্তারা তালেবানের সঙ্গে আলোচনা করেন ভবিষ্যতে কীভাবে কাবুল বিমানবন্দর পরিচালনা করা হবে। তুরস্কের সৈন্যরা গত ছয় বছর ধরে এই বিমানবন্দর পাহারা দিয়েছে। 
‘তুরস্কের সৈন্যদেরও আফগানিস্তান ছাড়তে হবে’ তালেবান আগে থেকে এমন দাবি জানালেও গত সপ্তাহে তালেবানের সঙ্গে তুরস্কের আলোচনায় গতিপথ যে বদলেছে তাতে কোনই সন্দেহ নাই।
প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বলেছেন, আফগানিস্তানের ঐক্যের জন্য তুরস্ক সব ধরণের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।
তালেবানের সঙ্গে এভাবে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান কিছু সুযোগ পেতে যাচ্ছেন। আফগানিস্তানে তালেবান যদি তাদের ক্ষমতা ধরে রাখতে চায়, তাদের অনেক আন্তর্জাতিক ত্রাণ এবং বিনিয়োগ দরকার হবে। তুরস্ক এক্ষেত্রে নিজেকে জামিনদার, মধ্যস্থতাকারী এবং সহায়তাকারী হিসেবে কাজে লাগবে। আর তুরস্ক হচ্ছে রাশিয়া বা চীনের চাইতেও বিশ্বস্ত এক মধ্যস্থতাকারী,যারা এখনো কাবুলে তাদের দূতাবাস খোলা রেখেছে।
 
তালেবান কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর অনেক দেশই তাদের সঙ্গে কিছু একটা সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করেছে দোহা চ্যানেলের মাধ্যমে। তবে সরাসরি উপস্থিতির মাধ্যমে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে তুরস্ক।
আফগানিস্তানের তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান তার পররাষ্ট্রনীতির 'দাবার বোর্ডটি' আরও বড় করতে পারবেন এবং এ নিয়ে তার রাজনৈতিক দল একে পার্টির সমর্থকদের কাছ থেকে বাহবা নিতেও পারবেন বলে অনেকে মনে করেন।।তুরস্কের অতীত অটোমান ঐতিহ্য ও খেলাফতের দেশ হিসেবে তুরস্ক এমন এক দেশ যে মুসলিম বিশ্বে তুরস্কের একটি ব্যতিক্রমী অবস্থান আছে।
 
এখন পর্যুন্ত বর্তমান তালেবানদের কথাবার্তা ও চালচলনে আনেকে আশাবাদী থাকলেও আসল অবস্থা কী হবে তার জন্য আমাদের আপেক্ষা করতে হবে কাবুলে নয়া সরকার গঠন করার পর পরবর্তী কার্যক্রম দেখে।
হাজার বছর ধরেই আফগানিস্তান সামরিক কৌশলগত কারণে বিভিন্ন সুলতান, সম্রাট,রাজা-বাদশাদের ক্ষমতা দখলের কড়িডোর হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বিগত অর্ধ শতকের ইাতহাসও  বড়ই বয়ংকর। এমতাবস্থায়  এই অনুর্বর পাহাড়ী পাথুরে মাটির সন্তান পাঠানরা এবার যদি এক হতে পারে। সব সংঘাত ভুলে নতুন আফগানিস্তান তৈরীতে মনো নিবেশ করতে পারে। তা হবে আনন্দের বিষয়, তাদের জন্য এবং বিশ্বের শান্তিকামী সব মানুষদের জন্যও।
 
 
 
 
 
 

অন্তরালের খবর এর আরো খবর