একবিংশ শতকের একবিংশ সালে
সামরিক,রাজনৈতিক শক্তির নয়া মেরুকরণ
বিশেষ প্রতিবেদক

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে পরার পর দীর্ঘদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একমাত্র পরাশক্তি হিসেবে গোটা বিশ্বকে চোখ রাঙালেও এখন আর তার চোখ রাঙ্গানিতে কাজ হচ্ছে না।
বিশ্ব আবারও নতুন নতুন পরাশক্তির উত্থানের পথে সামরিক অবস্থার নয়া মেরুকরণ শুরু হয়েছে। রাশিয়া আবারও তার সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে জানান দিচ্ছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর বিনা বাধায় বিশ্বমোড়লের দায়িত্ব পালন করতে পারবে না।
অন্যদিকে গণচীন বিশ্বের নয়া আর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি হয়ে ওঠায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নানা হুমকি ধামকি দিলেও চীনকে সমীহ না করে পারছে না।
এমতাস্থায় জো বাইডেন ক্ষমতা গ্রহণের পর চীনের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে প্রথমবারের মতো এক বৈঠক করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদরদফতর পেন্টাগন। দুই দেশের মধ্যে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিষয় সামনে রেখে দুই পক্ষের আলোচনা হয়। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরেই চীনকে আটকানোর পরিকল্পনা বিবেচনায় নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা নীতি বজায় রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। বাইডেন প্রশাসন জানিয়েছে, বেইজিংয়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শতাব্দীর ‘সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক পরীক্ষা’। 
তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগরে বেইজিংয়ের সামরিক কর্মকান্ড ও চীনের বিরুদ্ধে মানবাধিকার খর্বের অভিযোগ ও এর বাইরেও বাণিজ্যিক নানা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের টানাপড়েন ক্রমে বাড়ার মধ্যেই এই বৈঠক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন।
চীনের অর্থনৈতিক উত্থানকে কোন উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখা না হলেও মার্কিনরা চীনকে এখন এক হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে । অনেকেই  মনে করেন যে, চীন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ায় তাতে যুদ্ধ বেধে যাওয়ার ঝুঁকিও উঁকি মারে।
যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চীনের উত্থান চোখে পড়ার মতো ঠিকই, কিন্তু এখনো সার্বিকভাবে তাদের শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুলনীয় নয়। আমেরিকার সাথে চীন পাল্লা দিতে পারে শুধু পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অন্য কোথাও নয়।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় চীন যে সমরসজ্জা করছে তা মাপে বিশাল। চীন এমন সব বিশাল ও উন্নত প্রযুক্তি সমৃদ্ধ যুদ্ধজাহাজ তৈরি করছে - যা মানের দিক থেকে পশ্চিমা যুদ্ধজাহাজের কাছাকাছি।
ঐ অঞ্চলে চীন ক্রমশই আরো বেশি করে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। তারা যদি তাইওয়ানের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ যেন ঠেকিয়ে রাখা যায়, এমনটাই লক্ষ্য।
আপর দিকে মার্কিনরা চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধও শুরু হয়ে গেছে একথা স্পষ্ট করে বলা যায়। অতি সম্প্রতি  চীনা টেলিযোগাযোগ কোম্পানি হুয়াওয়ের ঘটনাবলী সবার নজর কেড়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের কোন যোগাযোগ নেটওয়ার্কে এ কোম্পানির প্রযুক্তি ব্যবহার করতে দিচ্ছে না। এমনকি তার মিত্রদেরকেও।
কারণ মেধাস্বত্ব চুরি ও গুপ্তচরবৃত্তি  এমন সব আভিযোগের কারণে চীনা প্রযুক্তিকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে।
এদিকে চীন বিভিন্নক্ষেত্রে একটা বৈশ্বিক ভুমিকায় অবতীর্ণ হতে চলেছে। চীনের অব্যাহত অর্থনৈতিক উন্নতি সেই ইঙ্গতই করে। তাই পরাশক্তিধর দেশ আমেরিকা চীনকে অনেকটাই সমীহ করতে শুরু করেছে। 
মধ্য এশিয়া ঘিরে নানান ঘটনা প্রবাহের মধ্যদিয়ে বিশ্বের সমারিক মেরুকরণ নতুন মাত্রার দৃষ্টিগোচর হচ্ছে।
আরব বসন্তের নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র’র নেতৃত্বে ন্যাঠো জোটের সদস্যরা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে সরকার উৎখাতের যে মহোৎসবে নেমেছিলো তার রাশ টানতে বাধ্য হচ্ছে।
সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতের পর ইরাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার পছন্দের পুতুল সরকারদের স্থায়ী করতে পারেনি। ইরাকের গরিষ্ঠ জনগণ শিয়া সম্প্রদায়ের। তাই সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতে লাভবান হয়েছে ইরান। বর্তমান ইরাকের শাসক ও জনগণ ক্রমেই ইরানমূখী হওয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তল্পিতল্পা গুছিয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে।
কর্ণেল গাদ্দাফিকে উৎখাত করে লিবিয়িয়াকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে আবারও কর্ণেল গাদ্দাফির পরিবারের সদস্যদের প্রত্যাবর্তনের কথা শোনা যাচ্ছে।
সম্প্রতি আফগানিস্তান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লেজ গুটিয়ে পলায়নও বলে দেয় মার্কিন পরাশক্তির সেই দিন আর নেই।
 
মার্কিন পরাশক্তির সিরিয়া সরকারকে উৎখাতের চেষ্ট নস্যাৎ করে রাশিয়া জানিয়ে দিয়েছে তারা এখনো পরাশক্তি।
এমন আবস্থায় রাশিয়া ও চীনের শক্তিবলয়ে যোগ দিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যর নতুন সামরিক শক্তি ইরান রাশিয়া ও চীনের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে নয়া বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে। 
একদা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর কৌশলগত বন্ধু পাকিস্তান এখন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর শত্রু না হলেও বন্ধু নেই।  চীনের সাথে পাকিস্তানের পুরনো বন্ধুত্ব এখন বজ্রকঠিন।
এদিকে ন্যাটো জোটের একমাত্র মুসলিম গরিষ্ঠ দেশ তুরস্কও এখন দ্বৈত ভূমিকায়। রাশিয়ার সাথে তুরস্কের সামরিক মাখামাখি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর অপছন্দ হলেও এবিষয়ে তুরষ্ক অনড়।
শত্রুর শত্রু এই শর্তে ভারতের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর বন্ধুত্বর গাটছড়া বাঁধলেও তা সবসময় মধুর নয়। তবে ভারতের ইসরাইল কানেকশন বলে দেয় যে সম্পর্ক ঠুনকোও নয়।
মধ্যপ্রাচ্যের বড় বিস্ময় ইরানের ভূরাজনৈতিক ও সামরিক অগ্রগতি মধ্যপ্রাচ্যকে এক নয়া ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সুন্নি মুসলমানরা যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পাখার নীচে আশ্রয় নিয়ে নিজেদের নিরাপদ ভাবছে। তখন শিয়া মুসলিম শাসিত ইরান মধ্যপ্রাচ্যকে নয়া স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে পরার পর একমাত্র পরশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর মাতব্বরীতে যে অনিরাপদ বিশ্ব গড়ে উঠেছিলো। 
রাশিয়ার পুনর্উত্থান শক্তিশালী চীনের উত্থানে সেই অবস্থার অনেকটা উন্নতির আশা করা যেতেই পারে। আর মধ্যপ্রাচ্যে তুরষ্কর ও ইরানের প্রভাবশালী ভূমিকা শান্তিময় না হোক ভারসাম্যময় শান্ত মধ্যপ্রাচ্যর স্বপ্ন বিশ্ব দেখতেই পারে।
কারণ ভারসাম্যময় বিশ্বই শান্তিময় বিশ্ব গড়তে পারে।
 

অন্তরালের খবর এর আরো খবর