রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনই একমাত্র পথ
ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা

সারা বিশ্বের মত বাংলাদেশও করোনা মহামারীর ভয়াবহ দাবানলে আক্রান্ত। দফায় দফায় লকডাউন দেশের অর্থনীতির শক্ত কোমড়টি ভেঙে দিচ্ছে। সরকারও নিরুপায়। কিছুই করার নেই চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া। তাদের জায়গা থেকে চেষ্টার কমতিও নেই। হাসপাতালে বেড নেই, পর্যাপ্ত ভ্যাক্সিন নেই, অদৃশ্য এ ভাইরাসকে একেবারে নির্মূল করার কোন পথও খোলা নেই, জানা নেই। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশই এই সঙ্কট মোকাবেলায় নিজেদের সমস্ত শক্তি ব্যবহার করছে। ঠিক সেই সময়ে বাংলাদেশের মধ্যে আরও একটি সঙ্কট দিনে দিনে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। আর তা হচ্ছে- রোহিঙ্গা সঙ্কট। দেশে যেমন করে করোনা আগ্রাসন চলছে ঠিক তেমনি চোখের আড়ালেই রোহিঙ্গা সঙ্কট বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ধরণের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
 
বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ এক কথায় ব্যর্থ। বিভিন্ন সময়ে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সাধারণ চোখে অনেক উদ্যোগ দেখা গেলেও এর কোনোটাই কার্যকরী হয়নি। এর প্রমাণ গত কয়েক বছর ধরে আমরা দেখতে পাচ্ছি। শুধু তাই নয়, বর্তমান পরিস্থিতি এমন যে রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি গভীরতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যত দেরি হচ্ছে সঙ্কট আরও তীব্র হচ্ছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন তো দূরের কথা, নতুন করে তাদের স্থায়ী ঠিকানা বাংলাদেশ করার পায়তারা চলছে। যা কখনও ই সম্ভব না, এবং মেনেও নেয়া যায় না।
 
সম্প্রতি আর্থিক ঋণের বিনিময়ে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের বাংলাদেশে রেখে দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এই প্রস্তাবে বিশ্বের অন্য উদ্বাস্তুদের মতো রোহিঙ্গাদেরও সমাজের মূল স্রোতে মিশে যাওয়ার অধিকারের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ওই ঋণ নিলে বা প্রস্তাবে রাজি হলে রোহিঙ্গারা সব নাগরিক সুবিধা ভোগ করবে এমনকি চাকরি-ব্যবসা করা সহ সারা দেশে চলাচলেরও স্বাধীনতা পাবে।
 
এমন প্রস্তাব দেশের জন্য খুবই হুমকি স্বরূপ। এটাকে এক প্রকার চক্রান্তও বলা যেতে পারে।
 
রোহিঙ্গাদের জন্য সবচেয়ে বেশি সম্পদ ব্যয় করছে বাংলাদেশ। অন্যান্য অনেক দেশ রোহিঙ্গাদের দেখ-ভালের জন্য জাতিসংঘকে অর্থ প্রদান করে। যদিও এই অর্থ প্রদানের পরিমাণ দিন দিন কমে আসছে এবং এর ফলে বাড়তি বোঝা বাংলাদেশের ওপর চাপানোর একটি চেষ্টা আছে বিদেশিদের।
 
এরই ধারাবাহিকতায় রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অবাধে কাজের সুযোগ করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। যদিও বাংলাদেশ এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করছে। উদ্বাস্তুদের আশ্রিত দেশের সমাজে অন্তর্ভুক্ত বা রেখে দেওয়ার জন্য বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাব মেনে না নিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে ইতিমধ্যে চিঠি দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। 
 
বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাব মেনে নিলে রোহিঙ্গারা যেকোনও স্থানে চলাচল করতে পারবে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অর্থাৎ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে পারবে বা ব্যবসা করতে পারবে। শুধু তাই না, তাদের নিবন্ধনের আওতায় এনে সামাজিক পরিচয়পত্রও দিতে হবে। যা কখনও গ্রহণযোগ্য নয়। এই প্রস্তাব আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যাখান করছি।
 
উদ্বাস্তু সমস্যা তিনভাবে সমাধান করা যায়। একটি হচ্ছে অন্তর্ভুক্তিকরণ, আরেকটি হচ্ছে তৃতীয় দেশে সেটেলমেন্ট এবং অপরটি হচ্ছে প্রত্যাবাসন। আমাদের জন্য তৃতীয় দেশে সেটেলমেন্ট ফিজিবল না। কারণ সংখ্যাটি অনেক বড়। যদি সংখ্যা ৩০ বা ৪০ হাজার হতো তাহলে বিভিন্ন দেশে ভাগ করে দেওয়া যেত। কিন্তু সংখ্যাটি ১০ লাখের ওপরে। এখন পৃথিবীর কোনও দেশ এই পরিমাণ মানুষ নেবে না, এটাই বাস্তবতা।
 
আরেকটি সমাধান হচ্ছে অন্তর্ভুক্তিকরণ, কিন্তু বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতির দেশ এবং এখানে প্রচুর শ্রমিক আছে। ফলে বাড়তি শ্রমিকের কোনও প্রয়োজন নেই এবং সে সম্ভাবনাও নেই।
 
সুতরাং আমাদের জন্য একমাত্র অপশন হচ্ছে রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে টেকসই ও সম্মানের সঙ্গে প্রত্যাবাসন। অন্তর্ভুক্তিকরণের বিষয়ে জাতিসংঘ বা বিশ্বব্যাংক চিন্তা করতে পারে কিন্তু আমরা এটি করতে পারবো না এবং এটি তাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দিতে হবে।
 
২০১৭ সালের আগস্ট মাসে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের পর সমস্যাটি যে এতটা জটিল হয়ে উঠবে, তা অনেকের ভাবনায়ও ছিল না। উপরন্তু এর কিছুদিন পরই বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি প্রত্যাবাসন চুক্তি হয়, যার ফলে মনে হয়েছিল দুই দেশের সমঝোতার মাধ্যমে কোনো ধরনের সংকট ছাড়াই বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যাবে এবং সমস্যাটি দীর্ঘায়িত হবে না। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমরা এই সমঝোতার কোনো বাস্তবিক প্রয়োগ দেখতে পাইনি।
 
২০১৮ সালের নভেম্বরে এবং ২০১৯ সালের আগস্টে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার ভিত্তিতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া শুরু করার উদ্যোগ দুবারই ব্যর্থ হয়। এর ফলে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে জনমনে ব্যাপক সংশয় তৈরি হয়।
 
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন ও ভারতসহ অনেক দেশই রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে থাকার কথা বলছে। কিন্তু মুখে ‘চাপ প্রয়োগের’ কথা বললেও তাতে মিয়ানমারের খুব একটা যায় আসেনি।
 
বিশ্লেষকরা বলছেন, এগুলো বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বহুপাক্ষিক কোনো উদ্যোগ নয়। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এবং বিভিন্ন ফোরামে বিষয়টি নিয়ে কথা বলছে সত্য, কিন্তু সমাধান চাইছে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিকভাবে। আরো স্পষ্ট করে বললে, বাংলাদেশ মনে করে সমস্যাটা মিয়ানমারের, বাংলাদেশ থার্ড পার্টি। ফলে মিয়ানমারকে বাধ্য করা যাচ্ছে না।
 
এদিকে, রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ অবস্থানের ফলে নানা রকম আর্থসামাজিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি দীর্ঘায়িত হওয়ায় শিবিরে রোহিঙ্গাদের দৈনন্দিন জীবনে সমস্যা ও বঞ্চনা বেড়ে চলেছে। রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে বৈষয়িক টানাপোড়েন ও মানসিক দূরত্ব বাড়ছে। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতির কারণে স্থানীয় পর্যায়ে জনসংখ্যাগত যে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের মধ্যে পারস্পরিক অসন্তোষ, সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।
 
আমার কথা হচ্ছে- এভাবে আর চলতে পারে না, চলতে দেয়া যায়ও না। সরকার যেভাবে করোনা মোকাবেলায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে, ঠিক তেমনি রোহিঙ্গা সঙ্কট মোকাবেলায় আরও জোড়ালো ভূমিকা রাখতে হবে। প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সমস্যার মূল কারণগুলোকে চিহ্নিত করে তার নিষ্পত্তি, যথোপযুক্ত পরিবেশ তৈরি এবং দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে।
 
সেই সঙ্গে আমি মনে করি- বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে এই দেশ তাদের নয়, এখানে তারা আশ্রিত। তাদের আসল ঠিকানা মিয়ানমার। আর সেই নিজ ভূমিতে তাদের ফিরে যেতেই হবে। এ জন্য প্রয়োজন হলে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের শরণার্থীরা ভারতে গিয়ে যেমন প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের দেশকে স্বাধীন করতে আবারও ফিরে এসেছিলো, সেভাবেই রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে ফিরে যেতে হবে। প্রথম পর্যায়ে আন্তর্জাতিকভাবে সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। আর যদি সোজা আঙুলে ঘি না ওঠে তবে কঠিন পথ বেছে নিতে হবে। কারণ মিয়ানমার এখন নিজেই আক্রান্ত। গত ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারে একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেছে। তখন ক্ষমতা গ্রহণকারী জেনারেল মিন অং হ্লাইং নিজেকে নতুন করে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। একইসঙ্গে আখ্যায়িত দেশটিতে চলমান জরুরি অবস্থা আগামী ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত বাড়িয়েছেন। ফলে রোহিঙ্গা ইস্যুর কোন সমাধান দু’একের মধ্যে আছে বলে মনে হচ্ছে না। 
 
একজন মানবাধিকার কর্মী হিসেবে আমার মত হচ্ছে- নিরাপদ প্রত্যাবর্তনই রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান। এত বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর ভরণপোষণের ভার বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল ও উন্নয়নশীল দেশ অনির্দিষ্টকালের জন্য বহন করবে, তা প্রত্যাশা করা যায় না। 
 
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন বিষয়ে কতগুলো ব্যবস্থা জরুরী ভিত্তিতে নিতে হবে। আর তা হচ্ছে- রোহিঙ্গাদের প্রশিক্ষিত নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। যাতে তারা নিজেদের অধিকার নিজেরাই প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। এই সংকটের একটি স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘে পাঁচ দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সেখানে তিনি ধর্ম ও গোত্রনির্বিশেষে মিয়ানমারে বসবাসরত সব বেসামরিক লোকজনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গাদের জন্য একটি ‘নিরাপদ এলাকা’ তৈরির কথা বলেন। 
 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক প্রদত্ত পাঁচ দফার আলোকে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান খোঁজা; মিয়ানমারের ওপর চাপ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশের বৈদেশিক মিশনগুলোর প্রচার কার্যক্রম বেগবান করা; স্থায়ী, সফল এবং স্বেচ্ছা প্রত্যাবর্তনের উদ্দেশ্যে রোহিঙ্গাদের যৌক্তিক দাবি বিবেচনায় নেওয়া; এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক ও উপ–আঞ্চলিক সংস্থা, যেমন সার্ক, আসিয়ান, বিমসটেক এবং ওআইসিকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে প্রভাবিত করা। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের শান্তি ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্যে জাতিসংঘের নিশ্চয়তা প্রদানকারীর ভূমিকা পালন নিশ্চিত করা। 
লেখক : বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার প্রতিষ্ঠিতা, সাবেক মন্ত্রী, বাংলাদেশ জাতীয় জোট তথা বাংলাদেশ ন্যাশনাল এলায়েন্সের (বিএনএ) ও তৃণমূল বিএনপির চেয়ারম্যান, সুপ্রীম কোর্টবারের সাবেক সভাপতি।

সর্বশেষ সংবাদ

মানবাধিকার এর আরো খবর