ভূ-রাজনীতি কোয়াড-এর প্রভাব এবং বাংলাদেশের অবস্থান
বিএম জুলফি

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভূ-রাজনীতির পালাবদল নতুন কিছু নয়। দক্ষিণ এশিয়ার নিয়ন্ত্রক দেশগুলোকে কেন্দ্র করে আবর্তিত রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সম্পর্কের পালাবদল হয়ে উঠেছে এ অঞ্চলের ভূ-রাজনীতির এক ঘনিষ্ঠ অনুষঙ্গ। দ্বিপক্ষীয় বিরোধে সৃষ্ট নানা আঞ্চলিক সংকট বরাবরই দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে প্রভাবিত করে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন চার দেশীয় জোট ‘কোয়াড’-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণের গুঞ্জনে চীনের কাটখোট্টা প্রতিক্রিয়া দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাঁকবদলের নতুন আভাস দিয়েছে। কোয়াডে অংশ নিলে বাংলাদেশ চীন সম্পর্কের অবনতি ঘটবে, চীনা রাষ্ট্রদূতের এই আগবাড়া হুশিয়ারির পর চীনের অসন্তোষের ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নেই। কোয়াডকে নিয়ে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক তৎপরতা দৃশ্যমান না হলেও এটিকে ঘিরে স্পষ্ট হয়ে ওঠা চীনের অস্বস্তি বারবারই উঠে এসেছে ভূ-রাজনীতির আলোচনায়।
প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরে স্বাধীন নৌ-চলাচল নিশ্চিতকরণসহ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় চীনা আগ্রাসন রুখতে ২০০৭ সালে শুরু হয় ‘কোয়াড্রিল্যাটেরাল সিকিউরিটি ডায়লগ’ বা কোয়াডের আলোচনা। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে কোয়াডের আলোচনা অব্যাহত থাকলেও পুরোপুরি কার্যকর হয়ে ওঠেনি এই জোটটি।  বিভিন্ন সময় চীনের সরাসরি বিরুদ্ধাচারণে দেশগুলোর আড়ষ্টতা, বিরোধ এড়ানোর মনোভাব ও যৌথ তৎপরতার অভাবই জোটটির শক্তিশালী হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে চীনের বিপক্ষে শক্তিশালী দেশগুলোর একাট্টা মনোভাবে নতুনভাবে জোরালো হয়ে উঠেছে কোয়াড প্রসঙ্গ।
নব্য পরাশক্তি চীনকে বাণিজ্যিকভাবে কোণঠাসা করতে আগাগোড়া কট্টর অবস্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্র, ডোকলাম ও লাদাখ সীমান্ত বিরোধ নিয়ে চীনের বিরুদ্ধে মুখিয়ে থাকা ভারত, অন্যদিকে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও ঐতিহাসিক শত্রু জাপান এবং চীনের প্রতি ক্রমেই তিক্ত হয়ে ওঠা অস্ট্রেলিয়ার অংশগ্রহণে গঠিত হওয়া কোয়াডকে ‘চীনবিরোধী অক্ষ’ আখ্যা দিয়েছে চীন। চীনের প্রতি মারমুখো অবস্থানে থাকা দেশগুলোর মাধ্যমে গঠিত এই জোটে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টতা চীনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠা মোটেও অস্বাভাবিক নয়।
সুবিধাজনক ভৌগোলিক অবস্থানের কল্যাণে ভারত, জাপান, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের নজরে থাকা বাংলাদেশ ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে নজর কেড়েছে চীনেরও। কৌশলগত ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশকে প্রয়োজন চীনের।
ভারতের সঙ্গে লাগোয়া অবস্থান, বঙ্গোপসাগরের সংযোগ, সস্তা শ্রমিকের সহজলভ্য ইত্যাদি কারণে চীনের ভূ-রাজনৈতিক পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের প্রতি মনোযোগী হতে বাধ্য হয়েছে এশিয়ার এই পরাশক্তি। চীনের অর্থনৈতিক কূটনীতি ও রপ্তানি বাণিজ্যেও জায়গা দখল করে আছে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর এই দেশটি। বলা যায়, বাংলাদেশকে ঘিরে এসব স্বার্থ-সংশ্লিষ্টতাই চীনকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী করে তুলেছে।
বাংলাদেশের সামরিক খাত বা অবকাঠামোগত উন্নয়নে চীনা সহায়তা চোখে পড়ার মতো। এ ছাড়া গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপন ও রেললাইন প্রকল্পসহ অন্যান্য মেগা প্রকল্পগুলোয় চীনের আগ্রহ আশার আলো দেখিয়েছে বাংলাদেশকে।
চীনা বাজারে বাংলাদেশের ৮ হাজারেরও বেশি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধাপ্রাপ্তিসহ বৃহৎ আকারের চীনা বিনিয়োগ বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিকভাবে লাভবান করছে। অন্যদিকে করোনা টিকা সরবরাহে চুক্তিবদ্ধ ভারত বকেয়া প্রতিষেধক পাঠাতে ব্যর্থ হওয়ায় টিকা ইস্যুতেও বাংলাদেশকে হতে হচ্ছে চীনের মুখাপেক্ষী।
কিন্তু কোয়াড নিয়ে বাংলাদেশের ভাবনা বেশিদূর গড়ালে তা চীন ও বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান নৈকট্যের পথে বড়সড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে এমনকি সেটি গড়াতে পারে ‘চীনবিরোধী’ তকমা পর্যন্তও।
মার্কিন-চীন বা ভারত-চীনের মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে চীনের রোষানলে পড়া বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের জন্য। এমতাবস্থায় বাংলাদেশ যথার্থ কৌশল অবলম্বনে ব্যর্থ হলে ভেস্তে যেতে পারে মুখোমুখি অবস্থানে থাকা শক্তিশালী দেশগুলোর সঙ্গে সুষম সম্পর্ক রক্ষার যাবতীয় সব উদ্যোগ। বাংলাদেশ নিয়ে চীনের অনাস্থা-সন্দেহ যাতে বেশিদূর না গড়ায়, সেদিকে লক্ষ রাখা উচিত।
ভারতের প্রতি নতজানু পররাষ্ট্রনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি। অন্যদিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সবচেয়ে বড় ক্রেতা যুক্তরাষ্ট্র, অকৃত্রিম বন্ধু জাপান বা ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, জাপান বা ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা যেন চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, সে লক্ষ্যে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। এশিয়ার দুই পরাশক্তির ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিজেকে বলির পাঁঠা হওয়া থেকে বাঁচাতে আরো বেশি কৌশলী হতে হবে বাংলাদেশকে, জোরদার করতে হবে সুষম ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যকার চলমান সংকটে নিজের পিঠ বাঁচাতে বাংলাদেশকে আরো বেশি সতর্ক হতে হবে, জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণে জোরালো করতে হবে কৌশলগত অবস্থানও। বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যকার চলমান সংকটে নীরব দর্শকের ভূমিকাই বাংলাদেশের সুবিধাজনক অবস্থানকে দৃঢ় করবে।
 
 

পররাষ্ট্র-বাংলাদেশ এর আরো খবর