শিক্ষা জরুরী তবে শিশুদের প্রাণের চেয়ে বেশি নয়

৫৪৪ দিন পর ১২ সেপ্টেম্বর, রবিবার শ্রেণিকক্ষে ফিরলো বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা।
দেড় বছর পর তাদের প্রিয় স্কুল প্রঙ্গণ আবারও মূখরিত হচ্ছে এইসব কচিকাঁচাদের কলরবে। তারা খুশি বন্ধু-সহপাঠীদের সাথে আবার দেখা হওয়ায়।
টেলিভিশনে প্রচারিত সরাসরি সম্প্রচারকৃত ভিডিওতে দেখা যায়, অনেকটা উৎসবমুখর পরিবেশেই স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীরা প্রবেশ করছে।
স্কুলে প্রবেশের সময় মাস্ক আছে কিনা সেটি যাচাই, না থাকলে বিতরণ, হ্যান্ড স্যানিটাইজার দেয়া এবং শরীরের তাপমাত্রা মাপা হচ্ছে। এছাড়া শ্রেণীকক্ষের ভেতরেও সামাজিক দূরত্ব রেখে শিক্ষার্থীদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
অনেক স্কুলেই শিক্ষার্থীদের ফুল এবং চকলেট দিয়ে স্বাগত জানাতে দেখা গেছে।
অনেক এলাকাতেই দেখা গেছে পথে পথে ছেলেমেয়েরা হেঁটে যাচ্ছে। কেউ অভিভাবকের সাথে। কেউ সহপাঠীদের সাথে দল বেঁধে। কেউবা একাকী। তাদের পরনে স্কুলপোশাক। পিঠে ব্যাগ। তাদের চেহারায় ছিল খুশির ঝিলিক, অনেকদিন পর বন্ধু-সহপাঠীদের সাথে দেখা হবার আনন্দ।
অনেক স্কুল নটায় ক্লাস শুরু হবার কথা। কিন্তু ভোর সাতটা থেকেই স্কুলের অনেক ছাত্রছাত্রী এসে ঘুরে যাচ্ছিল, সত্যিই স্কুল খুলছে কী না সেটা দেখতে।
 
বাংলাদেশে সর্বশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা ছিল ২০২০ সালের ১৬ই মার্চ। তার পরদিন ১৭ই মার্চ ছিল জাতীয় ছুটি। সেদিন বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বছরব্যাপী আয়োজনের প্রধান অনুষ্ঠানমালা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এরই মধ্যে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়লে তার এই যাত্রা বাতিল করা হয় শেষ মুহূর্তে। ১৮ই এপ্রিল থেকে বাংলাদেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। এমনকি পরবর্তীতে যে পাবলিক পরীক্ষাগুলো হওয়ার কথা ছিল সেগুলোও অনুষ্ঠিত হয়নি।
শিক্ষার্থীদের পূর্ববর্তী পরীক্ষাগুলোর ফলাফলের উপর ভিত্তি করে একটি ফলাফল প্রকাশ করা হয় যাকে ব্যাপকভাবে অটোপাশ বলে অভিহিত করা হয়েছে পরবর্তী দিনগুলোতে।
এর পর গত দেড় বছরেরও বেশি সময়ে দফায় দফায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটি বাড়ানোর কারণে স্কুল বন্ধ থাকায় শ্রেণীকক্ষে কোন পাঠদান হয়নি।
জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের প্রকাশিত এক নিবন্ধ থেকে জানা যায়, গত মার্চ মাস পর্যন্ত টানা এক বছর পৃথিবীজুড়ে প্রায় সতের কোটি শিক্ষার্থী শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় দশ কোটি শিশুই ছিল ১৪টি দেশের, যেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটি।
বিশ্বব্যাংকের এক হিসেব থেকে জানা যায়, ২০২০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল চার কোটির কিছু বেশি।
করোনাভাইরাস মহামারির কারণে শিক্ষা কার্যক্রম পৃথিবীজুড়েই ব্যহত হলেও টানা দেড় বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার নজির খুব কম দেশেই আছে।
গত ৩রা সেপ্টেম্বর শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি ১২ই সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশের সব স্কুল কলেজ খুলে দেয়ার ঘোষণা দেন। এরই ধারাবাহিকতায় প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক ও মাদ্রাসাসহ সব ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই খুলে দেয়া হচ্ছে। আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগামী ১৫ই অক্টোবর থেকে খুলে দেয়ার কথা।
 
১৯ দফা শর্ত মেনেই স্কুল খোলার আনুমোদন
 
স্কুল খোলার ১৯ দফা শর্ত জুড়ে দিয়েছে সরকার। এসব শর্ত ঠিক মতো পালিত হচ্ছে কিনা বা স্কুল খোলার পর করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি কেমন হয় তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে কর্তৃপক্ষ।
এসব শর্ত অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবস্থানের সময় শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং কর্মকর্তা, কর্মচারী সবাইকে সবসময় মাস্ক পরতে হবে। শিক্ষার্থীদের তিন ফুট শারীরিক দূরত্বে রাখা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিদিন নিয়মিত পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করার কথা আছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী শ্রেণি কক্ষে ৫ ফুটের চেয়ে ছোট আকারের বেঞ্চিতে একজন ও এর চেয়ে বড় আকারের বেঞ্চিতে দুজন শিক্ষার্থী বসানো যাবে।
কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম দিকে পাবলিক পরীক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরাই বেশি আসবে। বাকিদের স্কুলে আসার জন্য রোটেশন সিস্টেম অর্থাৎ আজ যারা আসবে তারা কাল আসবে না-এই নীতি অনুসরণের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
স্কুলগুলোকে পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত করা ছাড়াও স্কুলে কোভিড সংক্রান্ত ব্যবস্থা অর্থাৎ হাত ধোয়া, তাপমাত্রা পরীক্ষা ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করারও শর্ত রয়েছে।
এর আগে গত ২রা সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ঘোষণা করেছিলেন যে, চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় এবং নার্সিং ইনস্টিটিউটগুলোয় আগামী ১৩ই সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষার্থীদের সশরীরে উপস্থিতির মাধ্যমে ক্লাস শুরু হবে।
তবে আজ থেকে স্কুল-কলেজ খোলা থাকার কথা থাকলেও প্রায় এক হাজারের মতো কিন্ডারগার্টেন ও স্কুল খুলবে না।
এসব স্কুলের শিক্ষকরা মূলত আর্থিক অস্বচ্ছলতা, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী সংকটের কারণেই স্কুলগুলো বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।
এদিকে বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন স্কুল এবং কলেজ ঐক্য পরিষদ দাবি করোনাভাইরাস মহামারির কারণে নানা সংকটের মুখে ১০ হাজারের মত স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে।
 
দীর্ঘ দিন স্কুল বন্ধ থাকায় শিশুরা মুক্ত আলোবাতাস থেকে বঞ্চিত হওয়ায় তাদের কিছুটা মনিসিক বৈকল্য ঘটতে পারে। বিশেষ করে অনলাইন এডুকেশন সিস্টেমও শিশুদের জন্য খারাপ পরিণতি ডেকে আনার কারণ।
মনোবিজ্ঞানীদের আশঙ্কা অনলাইন ক্লাসের কারণে শিশুদের মোবাইল এবং ইন্টানেটের প্রতি আসক্তি বেড়েছে। এছাড়াও সন্তানদের মধ্যে আরো অনেক আচরণগত নানা পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।করোনা ভাইরাসের কারণে স্কুল বন্ধ থাকায় সারাক্ষণই বাসায় থাকায় সন্তানরা মোবাইল এবং ইন্টারনেটের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে মনোযোগ হারাচ্ছে পড়াশুনার ক্ষেত্রেও। অনেকের আচরণগত সমস্যা যেমন প্রচণ্ড জেদ, ইমোশনাল রিঅ্যাকশন, কান্নাকাটি করতে দেখা গেছে।
 
এদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুললেও নতুন সমস্যা হতে পারে সেখানে অন্য শিশুদের সাথে খাপ খাওয়ানো এবং শ্রেনীকক্ষে মনোযোগ বজায় রাখা কষ্টকর হবে শিশুদের জন্য। দেড় বছর ধরে বাচ্চারা যে রুটিনে অভ্যস্ত হয়েছে, তা থেকে আগের অবস্থায় ফিরে  যেতে খাপ-খাওয়াতে বেগ পেতে হবে।
 
বজ্রআঁটুনি ফষ্কা গ্যেরো !
 
স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী ভিড় এড়াতে অনেক স্কুলেই অভিভাবকদেরকে স্কুলের ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। এত যে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমেছে তা বলা যাবে না।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে দেখা গেছে শিশুদের আবিভাবক-মায়েরা স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করে গা ঘেষাঘেষি করে পুটপাতে দলবেধে বসে আছেন। অনেকেই মাস্ক খুলে প্রাণভরে শ্বাস নিয়েছেন। এভাবে যে তারা পরস্পরে করোনাভাইরাস আদানপ্রদান করছেন না তা কে বলবে !
এরপর দেখা গেছে স্কুলে দূরত্ব রেখে বসলেও স্কুল ছুটির পর গাঘেষাঘেষি করে ছাত্রছাত্রিরা জটলা করছে বা বের হচ্ছে। এতে সাময়িক স্বাস্থবিধি মানা হলেও এসবের উদ্যেশ্য যে ভণ্ডুল হচ্ছে তা বলাই বাহুল্য।
শিশুদের জন্য শিক্ষা জরুরী এবং তা উম্মুক্ত ক্যাম্পাসে তাও ঠিক। কিন্তু ছাত্র-অবিভাবকরা যদি স্বাস্থ্য সচেতন না হন তবে সবই বিফলে যাবে।
স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে করোনা যদি ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়ে তবে সরকার আবার বাধ্য হবে  সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে। কারণ শিক্ষা জরুরী তবে শিশুদের প্রাণের চেয়েও বেশি জরুরী নয়। তাই ছাত্র-আবিভাবকদের স্বাস্থ্য সচেতনতার উপরেই নির্ভর করবে অনেক কিছুই।

সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয় এর আরো খবর