পানিবন্দি হাজার হাজার পরিবার

দেশের উত্তরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। প্রতিদিন বিস্তার ঘটছে বন্যার। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। বাড়ছে বানভাসি অসহায় মানুষের সংখ্যা। নীলফামারীতে তিস্তা নদী, কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র ও ধরলা এবং গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উজানের ঢল অব্যাহত থাকায় পানি বাড়ছে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়ার সারিয়াকান্দির নদ-নদীতে। প্রতিদিন প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। তলিয়ে গেছে হাজার হাজার হেক্টর ফসলের ক্ষেত। একই অবস্থা বগুড়ার যমুনা; রাজবাড়ী ও ফরিদপুরের পদ্মা নদীতে।
 
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ১০টি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর প্রভাবে বন্যায় তলিয়ে গেছে গেছে ১৫ জেলার নিম্নাঞ্চল, যার মধ্যে ১১ জেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে।
 
বর্তমানে দেশের বন্যাকবলিত ১৫টি জেলা হলো- কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, পাবনা, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও শরীয়তপুর। আগামী ২৪ ঘণ্টায় কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, পাবনা, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও শরীয়তপুরের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। এছাড়া দেশের ১০ নদীর পানি ২২টি পয়েন্টে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে দুধকুমার, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, তিস্তা, ঘাঘট, তুরাগ, পদ্মা, আত্রাই ও ধলেশ্বরী।
 
আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর মোটামুটি সক্রিয় আছে এবং বঙ্গোপসাগরে মাঝারি অবস্থায় রয়েছে। রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এদিকে যমুনা নদী ও ধলেশ্বরীসহ বিভিন্ন নদীপাড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রায় ৮০ কিলোমিটার অংশে ভাঙন শুরু হয়েছে। ভারত থেকে প্রচন্ড গতিতে পানি বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসছে। পানির চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি গেট খুলে দেওয়া হয়েছে।
 
নীলফামারী: শুক্রবার ডালিয়ায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এর আগে সেখানে গত বুধবার বিকেল ৩টায় ওই পয়েন্টে বিপৎসীমার ৫৮ এবং বৃহস্পতিবার ২৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। তিস্তার পানি বিপত্সীমা অতিক্রম করায় ফের বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই, খগাখড়িবাড়ী, টেপাখড়িবাড়ী, খালিশা চাপানী, ঝুনাগাছ চাপানী ও গয়াবাড়ী ইউনিয়নের তিস্তা নদী বেষ্টিত ১৫ গ্রামের পাঁচ সহস্রাধিক পরিবার। চলতি বর্ষায় কয়েক দফায় এসব পরিবারের বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করায় চরম ভোগান্তিতে আছে বাসিন্দারা। গত রবিবার উপজেলার ঝুনাগাছ চাপনী ইউনিয়নের ভেণ্ডাবাড়ী গ্রামে তিস্তার বাঁধ ভেঙে ভোন্তিতে পড়া পরিবারগুলোর মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে।
 
কুড়িগ্রাম: জেলার চিলমারী পয়েন্টে গতকাল শুক্রবার বিকেল ৩টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপৎসীমার ৫০ সেন্টিমিটার এবং ধরলা নদীর ফেরিঘাট পয়েন্টে বিপৎসীমার ৪১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে। ফলে জেলার ১২টি ইউনিয়নের চর, দ্বীপচর ও নিম্নাঞ্চলের অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ১০ হাজার পরিবারের অর্ধ লাখ মানুষ। এ ছাড়া বন্যার পানিতে জেলার ২৫ হাজার ১৫০ হেক্টর বিভিন্ন ফসলের ক্ষেত নিমজ্জিত হয়েছে।
 
গাইবান্ধা: ব্রহ্মপুত্র নদ, ঘাঘট ও তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। তবে আগের দিনের তুলনায় গতকাল শুক্রবার পানি বেড়েছে কম। পাউবো জানায়, গতকাল বিকেল ৩টা পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের পানি ১ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ৫১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে এবং ঘাঘটের পানি ১ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। গাইবান্ধা সদর, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ২৯টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামের নিম্নাঞ্চল এবং চর এলাকায় ২০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে জেলা ত্রাণ অফিস জানিয়েছে। বাড়িঘর ও রাস্তায় পানি ওঠায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। গবাদি পশু নিয়েও তারা বিপাকে পড়েছেন। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। লোকজন বন্যার পানিতে সাঁতরে অথবা নৌকায় করে আশপাশের বাঁধ কিম্বা উঁচু স্থানে গিয়ে খাবার পানি সংগ্রহ করছেন।
 
বগুড়া: সংস্কারকাজ শেষ না হতেই বগুড়ার ধুনটে যমুনার বাঁধ রক্ষায় নির্মিত বানিয়াজান স্পারের আরো পাঁচ মিটার অংশ ভেঙে বিলীন হয়েছে নদীগর্ভে। পানির তোড়ে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে চতুর্থ দফায় ভাঙন শুরু হয় এই স্পারে। এ নিয়ে স্পারের প্রায় ৮৫ মিটার অংশ নদীতে বিলীন হয়েছে। ফলে ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ জনবসতি এলাকা। সারিয়াকান্দিতে যমুনা ও বাঙালি নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গতকাল দুপুরে যমুনার পানি বেড়ে বিপৎসীমার ৭৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
 
রাজশাহী: দ্বিতীয় দফায় পদ্মার পানি বাড়তে থাকায় রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নের কালিদাশখালী এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। এতে হুমকির মুখে রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় ও কালিদাশখালী গ্রাম। জিওব্যাগ ফেলে তা রক্ষার চেষ্টা করছে পাউবো। গতকাল পর্যন্ত ১২ হাজার ২৮৪টি বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলা হয়েছে। কালিদাশখালী গ্রামের সোলেমানের দোকানের পশ্চিম পাশ থেকে সামাদের বাড়ি পর্যন্ত ভাঙন এলাকার ২২০ মিটার পর্যন্ত জিওব্যাগ ফেলা হয়েছে।
 
ফরিদপুর: গোয়ালন্দ পয়েন্টে পদ্মার পানি বিদৎসীমার ৬৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানিবন্দি মানুষের জন্য সরকারি খাদ্য সহায়তা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন ফরিদপুর জেলা প্রশাসক অতুল সরকার। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। পানি বেড়ে সদর, চরভদ্রাসন, সদরপুর ও ভাঙ্গা উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ এখন পানিবন্দি। এসব এলাকার শতাধিক গ্রাম, ফসলি জমি, রাস্তা তলিয়ে গেছে। সরকারিভাবে এসব এলাকায় ৫০ টন চাল ও সাড়ে ৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
 
রাজবাড়ী: অব্যাহতভাবে পানি বাড়তে থাকায় রাজবাড়ীর চারটি উপজেলার পদ্মা তীরবর্তী ৩০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পাউবো জানিয়েছে, দৌলতদিয়া পয়েন্টে আট সেন্টিমিটার বেড়ে বন্যার পানি বিপৎসীমার ৬৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্য দুই পয়েন্টেও পানি বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সাত হাজার ৫১৫টি পানিবন্দি পরিবারের তালিকা করা হয়েছে। দুর্গত এলাকায় সাহায্য হিসেবে চাল ও নগদ টাকা পাঠানো হয়েছে।
 
এদিকে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান জানিয়েছেন, বন্যার পানি বাড়তে থাকলে স্থানীয় জনসাধারণকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসার জন্য জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়া দেশের ১১ জেলায় প্রাথমিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ পাঠানো হয়েছে।
 
জেলাগুলো হচ্ছে- কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও শরীয়তপুর।
 
ডা. এনামুর রহমান জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয়ে গঠিত মনিটরিং টিম সার্বক্ষণিক বন্যা পরিস্থিতি নজরে রাখছে। জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রয়োজন অনুযায়ী পরামর্শ করা হচ্ছে।

সর্বশেষ সংবাদ

সারাদেশ এর আরো খবর