ঈদ-উল আযহা ও কুরবানীর শিক্ষা
গাজী মুহাম্মদ শওকত আলী :

কুরবানী
কুরবানী সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ হচ্ছে, ‘‘নিশ্চয়ই (হে নবী!) আমি আপনাকে (নিয়ামত পূর্ণ) কাওসার দান করেছি, অতএব, আপনি আপনার ‘রব' এর সন্তুষ্টির জন্যে সালাত কায়েম করুণ ও তাঁর নামে কুরবানী করুন’’(সুরা আল কাওসার-১০৮/১-২)। রাসূল (স) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কুরবানী করবে না সে যেন ঈদগাহের কাছেও না আসে' (আহমদ ও ইবনে মাযাহ)। হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (স) বলেছেন, কুরবানীর দিনে মানবসন্তানের কোন নেক আমলই আল্লাহ তায়ালার নিকট তত প্রিয় নয়, যত প্রিয় কুরবানী করা। কুরবানীর পশুর শিং, পশম ও ক্ষুর কিয়ামতের দিন (মানুষের নেক আমলনামায়) এনে দেয়া হবে। কুরবানীর পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই তা আল্লাহর দরবারে পৌঁছে যায়। সুতরাং তোমরা আনন্দচিত্তে কুরবানী করো’’ (তিরমিযী)।
কুরবানীর অর্থ
আমাদের সমাজে বাংলায় প্রচলিত কুরবানী শব্দের অর্থ হচ্ছে, নিকটবর্তী হওয়া বা সান্নিধ্য লাভ করা। আল কুরআনে সুরা আল মায়েদার ২৭ নম্বর আয়াতে উল্লেখ আছে, ‘ইয ক্কাররাবা-ক্কুরবা-নান' অর্থাৎ যখন তার দু‘জনে কুরবানী পেশ করলো বা পশু জবাই করলো, কিংবা জবাই করে ফেলে আসল। সুরা আল কাওসারে বলা হয়েছে, ‘ফাছাল্লি লিরাবিবকা ওয়ানহার' অর্থাৎ অতএব, (হে নবী!) আপনার ‘রব'-এর স্মরণে সালাত আদায় করুণ ও তাঁর সন্তুষ্টির জন্যে কুরবানী করুণ'। এখানে ‘নাহার' বলতে কুরবানী বোঝানো হয়েছে। আসলে ‘নাহার' শব্দে আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, নহর, বিশেষ নিয়মে জবাই বা হত্যা করা কিংবা প্রিয় বস্তুকে জবাই বা ত্যাগ করা।
কুরবানীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
দুনিয়ায় মানব বসতির শুরুতেই কুরবানীর প্রচলন শুরু হয়েছে। পৃথিবীর প্রথম মানুষ আমাদের আদি পিতা ও নবী আদম (আ:) এর প্রথম সন্তান কাবিল ছিল আল্লাহ তায়ালা ও পিতা-মাতার অবাধ্য, নাস্তিক বা কাফের। কাবিলের ছোট ভাই, হযরত আদম (আ) এর দ্বিতীয় ছেলে হাবিল ছিল আল্লাহভক্ত ও মু‘মেন। সে সময় আল্লাহ তায়ালার হুকুমে জোড়া জোড়া সন্তান হতো। এক জন পুত্র ও এক জন কন্যা সন্তান। আল্লাহ তায়ালার বিধান মতো প্রথম জোড়ার পুত্রের সাথে দ্বিতীয় জোড়ার কন্যার বিয়ে বৈধ ছিল। কাবিল আল্লাহ তায়ালার বিধান মানতে রাজি ছিল না। সে চেয়ে ছিল তার জোড়ার সুন্দরী বোনকেই বিয়ে করবে। শেষ পর্যন্ত তাদের দু‘জনকে কুরবানী পেশ করার নির্দেশ দেয়া হলো। আর বলা হলো যার কুরবানী কবুল করা হবে সে-ই প্রথম জোড়ার সুন্দরী বড় বোন কে বিয়ে করবে। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা হচ্ছে, ‘(হে নবী!) আপনি এদের কাছে আদমের দুই সন্তানের গল্পটি যথাযথভাবে শুনিয়ে দিন; গল্পটি ছিলো, যখনই তারা দু‘জনে আল্লাহর নামে কুরবানী পেশ করলো, তখন তাদের মধ্যে একজনের (হাবিলের) কাছ থেকে কুরবানী কবুল করা হলো, আর একজনের (কাবিলের) কাছ থেকে কুরবানী কিছুতেই কবুল করা হলো না, (যার কুরবানী কবুল করা হয়নি) সে বললো আমি অবশ্যই তোমাকে (যার কুরবানী কবুল করা হলো তাকে) হত্যা করবো, সে বললো, আল্লাহ তায়ালাতো শুধু পরহেযগার লোকদের কাছ থেকেই কুরবানী কবুল করে থাকেন'(সুরা আল মায়েদা-৫/২৭)।
আল্লাহ তায়ালার আইন অমান্য করার জন্যেই পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম হত্যাকান্ড ঘটায় পিতা-মাতার  অবাধ্য সন্তান আল্লাহর দ্বীনের শত্রু, ‘কাবিল'। পৃথিবীর ইতিহাসে সর্ব প্রথম আল্লাহর আইন, বিধান বা দ্বীন অমান্য করা আর মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটালো আল্লাহর দ্বীনের শত্রু কাফের ‘কাবিল'। এটাই হচ্ছে নাস্তিক, কাফের ও শয়তানের কাজ, যা আল-কুরআনের সুরা আল মায়েদাসহ আরো কয়েকটি সুরায় উল্লেখ আছে। পৃথিবীতে কুরবানীর ইতিহাস ও হত্যার ঘটনা এখান থেকেই শুরু হয়েছে।
আজকে মুসলিম সমাজে কুরবানীর যে প্রচলন তা মূলত: মুসলিম মিল্লাতের বা জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ) এর দেখানো পথ বা সুন্নাত। হযরত ইব্রাহীম (আ) এর শতবর্ষ বয়সের পর আল্লাহ তায়ালা তাঁকে যে সন্তান দান করেছিলেন, তিনি আল্লাহ তায়ালা কতৃক আদিষ্ট হয়ে তাঁর সে কলিজার টুকরা হযরত ইসমাইল (আ) এর কুরবানীর সূত্র ধরে আজও কুরবানী প্রচলিত আছে।
হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর কুরবানীর সূত্রপাত
মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ) নমরুদ ও তার সাঙ্গ-পাঙ্গদের অত্যাচারে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে নিজ স্ত্রী হযরত সারাকে সাথে নিয়ে শাম দেশে (সিরিয়া) হিজরত করলেন। দুর্ভাগ্যক্রমে সেখানকার বাদশা ছিল জালিম ও ভীষণ বদ মেজাজী। বাদশার লোকেরা হযরত ইব্রাহীম (আ.) ও তাঁর সুন্দরী স্ত্রী হযরত সারার আগমনের সংবাদ বাদশার দরবারে পৌঁছে দিলে বাদশা তাদেরকে ধরে নিয়ে আসতে বলে। বাদশার লোকেরা হযরত ইব্রাহীম (আ) ও তাঁর স্ত্রী সারাকে বাদশার দরবারে হাজির করে। বাদশা হযরত ইব্রাহীম (আ- এর কাছে জানতে চায় তার সাথে স্ত্রী লোকটি কে? ইব্রাহীম (আ) চিন্তা করলেন, স্ত্রী বললে হয়তো বা তাঁকে মেরে ফেলতে পারে, তাই তিনি বলেন সে আমার দ্বীনি বোন। বাদশা হযরত ইব্রাহীম (আ) কে বন্দী করে, আর হযরত সারাকে বাদশার বদস্বভাব চরিতার্থ করার জন্যে রেখে দেয়। বাদশার কু-প্রস্তাবে হযরত সারা রাজি নাহলে বাদশা তাঁকে হত্যার হুমকী দেয়। অত:পর হযরত সারা দু‘রাকা‘আত সালাত আদায় করার অনুমতি চাইলে বাদশা তাঁকে সালাত আদায়ের ব্যবস্থা করতে দেয়। হযরত সারা সালাত শেষে আল্লাহ দরবারে ফরিয়াদ করেন যেন আল্লাহ তায়ালা তাঁর সতীত্ব রক্ষা করেন। এরই মধ্যে বাদশা অত্যন্ত অসুস্থ্য ও দুর্বল হয়ে পড়ে। অবস্থা খারাপ দেখে আর বাদশার মৃত্যুর জন্যে তার লোকেরা হযরত সারাকে দায়ী করবে ভেবে হযরত সারা  বাদশার সুস্থতার জন্যে দোয়া করেন। একে একে তিন বার একই ঘটনা ঘটলে বাদশা হযরত সারার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। হযরত সারার সতীত্ব দেখে আর এক সতী নারী হযরত হাযেরাকে তাঁর দাসী হিসেবে সঙ্গে দিয়ে তাঁদেরকে বিদায় করে দেয়।
হযরত সারা ও হযরত ইব্রাহীম (আ) মুক্ত হয়ে সে দেশে বসবাস শুরু করেন। হযরত সারা তাঁর দাসী হযরত হাযেরাকে হযরত ইব্রাহীম (আ)-এর সাথে বিয়ে দেন। কারণ হযরত সারার বয়স তখন ৯০ বছর আর হযরত ইব্রাহীম (আ) এর বয়স তখন ১০০ বছর। তাদের বিয়ের দীর্ঘ সময় পার হলেও তখনো হযরত সারা মা হতে পারেননি। তিনি ভাবলেন শেষ বয়সে যদি আল্লাহ তায়ালা মেহেরবানী করে তাঁর স্বামী হযরত ইব্রাহীম (আ) কে কোন সন্তান দান করেন। এই  হযরত হাযেরার গর্ভেই হযরত ইসমাইল (আ)-এর জন্ম হয়।
হযরত ইসমাইল (আ)-এর জন্মের পর হযরত ইব্রাহীম (আ) তাঁর স্ত্রী হযরত হাযেরার কলিজার টুকরা ছেলেকে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে কা‘বা ঘরের নিকটবর্তী সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের পাদদেশে নির্জন স্থানে সামান্য কিছু খেজুর ও এক মসক পানিসহ রেখে আসেন। হযরত ইব্রাহীম (আ) যখন তাদেরকে এ অবস্থায় রেখে স্থান ত্যাগ করছিলেন, তখন হযরত হাযেরা  প্রশ্ন করছিলেন, আপনি আমাদের এ নির্জন স্থানে রেখে চলে যাচ্ছেন? হযরত ইব্রাহীম (আ) ক্ষীণ কণ্ঠে জবাব দিয়েছিলেন, হ্যাঁ। আবারো হযরত হাযেরা প্রশ্ন করলেন, এটা কি আল্লাহ্ তায়ালার নির্দেশ? হযরত ইব্রাহীম (আ) আবারও জবাব দিয়েছিলেন, হ্যাঁ। হযরত হাযেরা আল্লাহ্ তায়ালার ওপর ভরসা করে তাঁর শিশু সন্তানকে নিয়ে সেখানেই অবস্থান করলেন।
সে সময় কা‘বা ঘরের তেমন কোন চিহ্ন ছিলো না। কা‘বা ঘরের ভিটিটি যমীন থেকে বেশ উঁচু ছিল। বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট বন্যায় চার পাশ ভেঙে গিয়েছিল। হযরত হাযেরা ও তাঁর সন্তানের খাদ্য ও পানীয় যখন শেষ হয়ে গেল হযরত হাযেরা তখন খাদ্য ও পানির সন্ধানে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে দৌড়া দৌড়ি শুরু করেন। যখন নিরাশ হয়ে ফিরছিলেন তখন একটি আওয়াজ শুনতে পান। হযরত হাযেরা বলেন, কে আছ আমি তোমার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি, সম্ভব হলে তুমি আমাকে আল্লাহর ওয়াস্তে একটু সাহায্য করো। হঠাৎ তিনি তাঁর শিশু পুত্র ইসমাইল (আ)-এর  কাছে একজন লোক (ফেরেশতা) দেখতে পেলেন। সে (ফেরেশতা) তাঁর পায়ের গোড়ালী অথবা ডানা দ্বারা যমীনে আঘাত করলে অথবা হযরত ইসমাইল (আ)-এর কান্নাজনিত পায়ের গোড়ালীর ঘর্ষণে নীচ থেকে পানির ফোয়ারা  প্রবাহিত হতে লাগলো। এ সেই ফোয়ারা বা কূপ যা বর্তমানে যমযম নামে বিশ্ব মুসলিমের কাছে পরিচিত। যে সুপেয় পানীয় হিসেবে পান করে পরিতৃপ্ত হয় মুসলমাগণ। তাও কা'বাকে কেন্দ্র করে ও হযরত ইসমাইল (আঃ)-এর উছিলায় আল্লাহ তায়ালার করুণায় সৃষ্টি হয়েছে।
হযরত হায়েরা তাঁর মশক পূর্ণ করে নিলেন আর নিজেও তৃপ্তির সাথে পানি পান করলেন। এতে তাঁর ক্ষুধা নিবারণ হলো ও তাঁর শিশু পুত্রের জন্যে প্রয়োজনীয় দুধেরও ব্যবস্থা হলো। হযরত হাযেরা সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে ক্রমাগত ৭ বার দৌড়াদৌড়ি করার কারণে সে ঘটনাকে কেন্দ্র করে আল্লাহ সোবহানাহু ওয়া তায়ালা হজ্জ ও ওমরাহ পালনকারীদের জন্যে সাফা মারওয়া পাহাড়ে ৭ বার দৌড়াদৌড়ি করার বিধান জারি করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘‘অবশ্যই ‘সাফা ও মারওয়া' পাহাড় দু'টো আল্লাহ তায়ালার নিদর্শন সমূহের অন্যতম, অতএব, যদি তোমাদের মধ্যে কোন লোক হজ্জ বা ওমরাহ আদায় করার এরাদা করে তার জন্যে এই উভয় পাহাড়ের মাঝে ‘সাঈ' করতে হবে। কেননা যদি কোন ব্যক্তি অন্তরে নিষ্ঠার সাথে কোন ভালো কাজ করে তাহলে তারা যেন জেনে রাখে, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তায়ালা কৃতজ্ঞতাপরায়ণ ও প্রভূত জ্ঞানের অধিকারী’’ (সূরা বাকারা-২/১৫৮)।
হযরত ইসমাইল (আঃ) এর যখন হাঁটা-চলা ও খেলাধুলা করার বয়স তখন হযরত ইব্রাহীম (আঃ)কে স্বপ্নে আদেশ করা হলো, তুমি তোমার প্রিয় বস্তু আল্লাহর নামে কুরবানী করো। ইব্রাহীম (আঃ) স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে ১০ টি উট কুরবানী করলেন। পুনরায় তিনি আবারো একই সপ্ন দেখলেন। অতপর ইব্রাহীম (আঃ) আবারো ১০০ টি উট কুরবানী করলেন। আবারো তিনি একই সপ্ন দেখে ভাবলেন, আমার কাছেতো এ মুহূর্তে আমার কলিজার টুকরা প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আঃ) ছাড়া আর তেমন কোন প্রিয় বস্তুু নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন, অতঃপর আমি তাকে (হযরত ইব্রাহীম (আঃ)কে একজন ধৈর্য্যশীল পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দান করলাম। সে যখন পিতার সাথে হাঁটা-চলার উপযোগী হলো, তিনি (ইব্রাহীম আ:) বললেন, হে আমার পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে কুরবানী করছি। সুতরাং তোমার মতামত কি? সে (হযরত ইসমাইল আ:) বললেন, হে আমার পিতা! আপনি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছেন তা পালন করুন। আপনি আমাকে আল্লাহর মেহেরবাণীতে ধৈর্য্যশীলদের একজন পাবেন। অতঃপর যখন তাঁরা দু'জন একমত হলো আর আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছার সামনে আত্মসমর্পণ করলো এবং ইব্রাহীম (আঃ) ইসমাইল (আঃ) কে জবাই করার জন্যে কাত করে শুইয়ে দিলো; তখন আমি ইব্রাহীমকে ডাকদিয়ে বললাম, হে ইব্রাহীম তুমি তোমার স্বপ্নকে সত্যে রূপ দিয়েছো। নিশ্চয়ই এটা ছিল ইব্রাহীম ও ইসমাইলের জন্যে একটা পরীক্ষা। অতঃপর আমি ইব্রাহীমকে দান করলাম একটি মহা কুরবানীর পশু। অনাগত মানুষের জন্যে এ (কুরবানীর) বিধান চালু রেখে, তাঁর স্মরণ আমি অব্যাহত রেখে দিলাম। শান্তি বর্ষিত হোক ইব্রাহীমের ওপর। আমি এভাবেই সৎপরায়ণ ব্যক্তিদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। ’’(সুরা আস সফফাত-১০১-১০৯)।
কুরবানীর তাৎপর্য ও গুরুত্ব :
হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, কতিপয় সাহাবা রাসূল (সাঃ)কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) কুরবানী কি? রাসূল (সাঃ) বললেন, কুরবানী মুসলিম মিল্লাতের বা জাতির পিতা ইব্রাহীম (আঃ) এর সুন্নাত। তারা আবারো প্রশ্ন করলেন, এর মধ্যে আমাদের জন্যে কি আছে ?  রাসূল (সাঃ) বললেন, কুরবানীর পশুর প্রতিটা পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকী আছে। তারা বললেন, ভেড়ারতো অসংখ্য পশম আছে। রাসূল (সাঃ) বললেন, ভেড়ার প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকী দেয়া হবে, যদি তা খালেস নিয়তে কুরবানী করা হয়' (ইবনে মাযাহ)। আবু দাউদ শরীফের এক হাদীসে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সাঃ) বলেছেন, আল্লাহর নিকট সবচেয়ে মর্যাদার দিন হচ্ছে কুরবানীর দিন।
কুরবানীর শিক্ষা
কুরবানী কোন চাপ বা জবদস্তির বিষয় নয়। মানুষ সেচ্ছায় তার প্রতিপালকের সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় সবচাইতে প্রিয় বস্তুু ত্যাগ করার মানসিকতা সৃষ্টি করে। যেমন হযরত ইব্রাহীম (আঃ) শুধু মাত্র স্বপ্নে দেখেছেন, তোমার প্রিয় বস্তু আল্লাহর রাহে কুরবানী করো। আর অমনি তিনি তাঁর আদরের একমাত্র সন্তান হযরত ইসমাইল (আঃ)কে কুরবানীর জন্যে সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত হচ্ছিলেন। পৃথিবীতে মানুষের কাছে সবচাইতে আকর্ষণীয় বস্তুর মধ্যে অর্থ-সম্পদ বা টাকা-কড়ি আর সন্তান অন্যতম। মহান আল্লাহর প্রেমে ও তাঁর নির্দেশের প্রাধান্য দানকল্পে। এই অর্থ-সম্পদের মোহ ত্যাগের এ মানসিকতা সৃষ্টি করাই হচ্ছে কুরবানীর শিক্ষা। কুরবানী আমাদের ঈমান ও তাকওয়া বৃদ্ধি করে ও পরকালের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করে। রাসূল (সাঃ) নির্দেশ করেছেন, হে লোকসকল তোমরা ত্রুটিমুক্ত ও উত্তম প্রাণী কুরবানী করো, কারণ কুরবানীর এ পশুগুলো হবে তোমাদের জান্নাতে যাওয়ার বাহন'(বায়হকী)।
কুরবানী সচ্ছল সকল মুসলমানের ওপর ওয়াযিব। কুরবানীর গোস্তের ওপর আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর, গরীব-মিসকিনের ও মুসাফিরের হক আছে। খেয়াল রাখতে হবে সমাজের কোন একজন ব্যক্তিও যেন কুরবানীর গোস্ত থেকে বঞ্চিত না হয়। কিন্তু কুরবানীর চামড়া শুধু মাত্র যাকাতের হক দারদেরই প্রাপ্য। কুরবানীর ব্যাপারে দৃষ্ট আকর্ষণ :- আমাদের সমাজে উট, গরু, মহিষ এ ধরনের পশু ৭ ভাগে কুরবানী করা হয়। এক্ষেত্রে সমমনা ও সম-আর্থিক সঙ্গতি সম্পন্ন লোকদেরই একত্রে কুরবানী করা উচিত। অনেকেই আবার কুরবানীর পশুতে আকিকার জন্যে এক ভাগ বা দুই ভাগ রাখেন। এতে আকিকা সহীহ হবে না। আকিকার জন্যে ছেলে হলে দু'টি ভেড়া বা বকরী আর মেয়ে হলে একটি ভেড়া বা বকরী নির্ধারণ করতে হবে। আর মনে রাখতে হবে কুরবানীর সাথে আকিকার কোন সম্পর্ক নেই। কুরবানী ঈদ-উল আজহার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ও ধনীর জন্যে এটা আনন্দের আর গরীবের জন্যে স্বস্তির।
 
লেখক: গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী।
 
 

সর্বশেষ সংবাদ