করোনায় আক্রান্ত সাংবাদিকের অভিজ্ঞতা
আবদুল্লাহ আল ইমরান

করোনায় আক্রান্ত হবার পর আজকেই বোধহয় সবচেয়ে ভালো অনুভব করছি আমরা। উপসর্গগুলো জান-প্রাণ লড়াই শেষে দূর্বল হয়ে পড়েছে। এই ভালো, এই মন্দ পরিস্থিতিরও উন্নতি ঘটেছে।
 
মৃদু উপসর্গ নিয়ে কিংবা একেবারেই উপসর্গহীন থেকেও অনেকে করোনা যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন। অবশ্যই তারা ভাগ্যবান। কিন্তু আমরা অতোটা নই। বেশ ভোগান্তি পোহাতে হলো।
 
জ্বর-কাশিসহ সব উপসর্গ তো ছিলই, সঙ্গে বমি ও কানের চারপাশে ভয়ানক ব্যথা পরিস্থিতি অসহনীয় করে তোলে। সঙ্গে স্বাদ-গন্ধহীন অদ্ভূত এক জীবন।
 
ভালো আছি বলতেও এখন সংকোচ হয়, কেননা মাঝে এক রাতে ভালো বোধ করার ঠিক পরদিনই একাধিকবার বমি করে, নি:শ্বাসের জটিলতায় ভূগতে শুরু করে তিন্নি। ডাক্তার জানায়, দুশ্চিন্তা ও ঘুম না হওয়ায় এমনটা হতে পারে।
 
করোনার অভিজ্ঞতায় এ পর্যন্ত যা মনে হচ্ছে, তাতে চিন্তামুক্ত থাকাতে পারাটাই সবচেয়ে জরুরি এবং এ রোগের মহা ঔষধও বলা যায়। একটা উদাহরণ দেই।
 
আক্রান্ত হওয়ার দ্বিতীয় দিন থেকে নাকের ঘ্রাণ এবং মুখের স্বাদ হারিয়ে গেছে। ডাক্তারের পরামর্শে প্রটিন আর ভিটামিন সি জাতীয় খাবার খাচ্ছিলাম জোর করে। ধীরে ধীরে জ্বর-কাশি কমতে শুরু করলেও শারীরিক দূর্বলতা কাটে না। ফিরে আসে না ঘ্রাণ ও স্বাদ নেওয়ার ক্ষমতাও। এমনই এক ভোর হয় হয় রাতে বিবিসির রিপোর্টে পড়লাম, মুখের স্বাদ-গন্ধ চলে যাওয়া মানেই রেড এলার্ট। করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদের নাকি আজীবনের জন্য এই ক্ষমতা চলে যেতে পারে! ফিরে পেলেও লাগতে পারে এক থেকে দেড় বছর!
একবার চিন্তা করুন তো, আপনি পৃথিবীর কোনো কিছুর ঘ্রাণ পাবেন না, এমনকি প্রিয় কাঁঠালচাপারও, কোনো খাবারের স্বাদ পাবেন না, সে যতোই প্রিয় খাবার হোক, এ শাস্তি কি মৃত্যুর চেয়ে কোনো অংশে কম?
 
ফলে খবর পড়াও বাদ। না চাইতেও এমন সব খবর চলে আসে সামনে। নিজেকে ব্যস্ত রাখতে ঘরের কাজে মন দিলাম। এ এমন এক দমবন্ধ করা অস্থির সময়, যখন শরীর-মন ভালো থাকুক বা না থাকুক, একটা লেবুও আপনাকে কেউ কেটে দেবে না, নিজেকেই কেটে খেতে হবে। যতোটা পারা যায়, একে অন্যের সেবা করতে হবে। আলাদা ঘরে থাকলেও খানিক পর পর গিয়ে দেখতে হবে, প্রিয়তম সঙ্গী ঠিকঠাক নি:শ্বাস নিচ্ছে কি না, এখনও বেঁচে আছে কি না!
 
লেখক হিসেবে সৃষ্টিকর্তা আমাকে মানুষের অনুভূতি প্রকাশের ক্ষমতা দিয়েছেন কিন্তু সত্যি বলতে কি, এইসব মুহুর্তগুলোর গভীরতা কিভাবে প্রকাশ করা যায় তা আমার জানা নেই, জানা নেই প্রকৃত শব্দও।
 
পরিবারের ফোনও ধরতে পারিনি। কারো ম্যাসেজেরই উত্তর দিতে পারিনি। এতোকিছুর মধ্যেও চেষ্টা করেছি বাবা-মাকে ইতিবাচক সাড়া দিতে। আমার মা হার্টের রোগি, তিন্নির মা বয়সের ভারে চলতে ফিরতে পারেন না। বাবারাও নানা জটিলতায় ভূগছে। ফলে যতোই কষ্টে থাকি, তাদের জানিয়েছি ঠিক আছি। কন্ঠে জোর ধরে রেখে বলেছি, কোথাও কোনো অসুবিধা নেই। এতে অবশ্য কাজ হয়নি। তারা নানা কৌশলে, বহু মাধ্যমে আমাদের প্রকৃত অবস্থা জানার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। শুভেচ্ছা দূত নিয়োগ করেছেন। মা-বাবার মন!
 
সব ঠিক থাকলে ঈদের আগে বা পরে পুনরায় টেষ্ট করাবো। পর পর দুইবার নেগেটিভ এলে এই যাত্রায় রক্ষা। খবর পড়ব না পড়ব না করেও আজকেই পড়লাম, আক্রান্ত হয়ে ফলোআপ টেস্টে প্রথমবার নেগেটিভ এলেও দ্বিতীয়বার পজেটিভ এসেছে এক নারীর। ফের ১৪ দিনের যুদ্ধ। এই অনন্ত যুদ্ধে যেন আমাদের পড়তে না হয়, সেই দোয়া চাইছি সবার কাছে।
 
কখন যে দিন যাচ্ছে, কখন রাত, বুঝতে পারছি না। সময়গুলোকে স্থবির আর দুর্বিসহ লাগছে। না বই পড়তে, না প্রিয় চলচ্চিত্র দেখতে, না কারো সঙ্গে কথা বলতে, কিছুই ভালো লাগছে না।
 
মাথায় কতো গল্পের প্লট, উপন্যাসের চরিত্রেরা ছোটাছুটি করছে। কিন্তু লিখতে পারছি না। এ এক ভয়ানক যন্ত্রণা। জীবনে অনেক কিছু হেলায় হারিয়েছি। কোনো কিছু নিয়েই আমার অনুশোচনা হয়নি। অনুতাপও নেই। কিন্তু লিখতে চেয়েও না পারলে আমার খুব অস্থির লাগে। অনুশোচনা হয়!
 
কেন লিখি- এ প্রশ্নের উত্তরে একেক লেখক একেক কথা বলেন। আমার উত্তরটা সরল । আমি তুমুলভাবে অতীতে বাস করা মানুষ। একমাত্র লিখতে বসলেই অতীত ভ্রমণের দূর্লভ সুযোগ মেলে আমার। বহুরঙা স্মৃতির মুখোমুখি হই তখন। দেখা পাই হারানো প্রিয় মুখগুলোর। রাত জেগে জেগে নতুন কিছু লেখা মানে, ফেলে আসা পথে অলৌকিক যাত্রা। যে যাত্রা আমাকে জাগিয়ে রাখে ভোর থেকে ভোর!
 
অনেকেই জানিয়েছেন, এই কঠিন সময়ে আমাদের জন্যে নামাজ পড়ে দোয়া করেছেন। মনে পড়লে, আমার বই পড়েছেন কেউ কেউ।
কাছের মানুষের বাইরেও স্বল্পচেনা, এমনকি কোনো দিন কথা হয়নি এমন অচেনা মানুষের উৎকন্ঠিত বার্তা পেয়ে বুঝতে পেরেছি, কেবল প্রকাশ্য নয়, অপ্রকাশ্য ভালোবাসার শক্তিও কতোটা প্রবল, কতোটা গভীর!‍
 
এইসব নিরন্নেরকাল শেষ হলে, আবার পূর্ণদ্যমে লিখতে চাই। কতো কতো গল্প বলা বাকি। বারোয়ারি উপলব্ধিতে ঠাসা মোহান্ধ জীবনের গল্প লেখা বাকি! সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই সেসব গল্প বলার সুযোগ দেবেন আমাকে।
 
আমি কল্পনা করি, আমার গল্পের মেঠোপথ ধরে হেটে যাচ্ছে পাঠকেরা। গল্পের ফুল-পাখি-নদী দেখে তারা মুগ্ধ হচ্ছে। হিজল গাছের ছায়ায় জিরিয়ে নিচ্ছে খানিক। বসন্ত হাওয়ায় টুপ করে ঝরে পড়ুছে শুকনো পাতা। কুড়িয়ে নিতে নিতে তারা দেখছে সমুদ্রের টানে বয়ে চলা বেখেয়ালি নদী...! আমার লেখা পড়ে তারা হাসছে, সম্ভাব্য বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে আঁচলে চোখ মুছে নিচ্ছে - কল্পনায় এমন মোহনীয় দৃশ্য আমায় আবেগতাড়িত করে। আমার ঘুম হয় না, একলা লাগে। বুকের ভেতর পাখির পালকের মতো ভেসে বেড়ায় শুভ্র হাহাকার!

বিশেষ প্রতিবেদন এর আরো খবর