সেই বিমান ছিনতাইকারীকে নিয়ে যা বললেন তার বাবা

বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টার ঘটনায় সেনা কমান্ডোদের হাতে নিহত মাহাদীর ওরফে মাজিদুল ওরফে পলাশ (২৩) । তার বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার পিরোজপুরের দুধঘাটা গ্রামে। তার বাবার নাম পিয়ার জাহান সরদার। সে ওই উড়োজাহাজের ১৭/এ নম্বর আসনের যাত্রী ছিল। গ্রামের সবাই তাকে পলাশ নামেই চিনত। গ্রামের বাইরে পলাশ নিজেকে মাহাদী নামে পরিচয় দিত। সোমবার দুপুরের পলাশের (মাহাদী) বাবা মুদি দোকানি পিয়ার জাহান বলেন, পলাশ সোনারগাঁয়ের তাহেরপুর মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করে সোনারগাঁ ডিগ্রি কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হয়। এরপর সে আর পড়াশোনা করেনি। পিয়ার জাহান আরও বলেন, গত শুক্রবার ছেলে (পলাশ) আমাকে জানায় সে আর বাংলাদেশে থাকবে না। দুবাই চলে যাবে। এ কারণে সে আমার কাছে ৫০০ দিরহাম দাবি করে এয়ারপোর্টে দেখানোর জন্য। আমি সেই টাকা জোগাড় করে দেই। পিয়ার জাহানের দাবি, পলাশ তাদের অবাধ্য সন্তান। এর আগেও বিদেশে যাওয়ার কথা বলে সে অনেক টাকা নষ্ট করেছে। যে কারণে ছেলের সঙ্গে তিনি ঠিকমতো কথা বলতেন না। পলাশের (মাহাদী) বাবা বলেন, গত ১০ মাস আগে চিত্রনায়িকা সিমলাকে নিয়ে পলাশ বাসায় আসে। তখন সে জানায় সিমলাকে নিয়ে এলাকায় বেড়াতে এসেছে। কিন্তু দেড় থেকে দুই মাস পর লোকজনের মাধ্যমে জানতে পারি তাদের বিয়ে হয়েছে। এর ঠিক দেড় থেকে দুই মাস পরে পলাশ আবারও সিমলাকে নিয়ে বাড়ি আসে। তখন জানায় সিমলাকে সে বিয়ে করেছে। প্রথমে না মানলেও পরবর্তীতে বিয়ে মেনে নেই এবং বউকে (সিমলা) বলি ছেলেকে ভালো করে তুলতে। এরপর পলাশের সঙ্গে তেমন যোগাযোগ হতো না। পলাশের বাবা পিয়ার জাহান আরও বলেন, এর আগে পলাশ আরেকটি বিয়ে করে বগুড়ায়। তার একটি বাচ্চাও আছে। কিন্তু প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে তার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। এছাড়া, এলাকায় নারী কেলেঙ্কারির একটি ঘটনায় মামলাও হয়েছিল পলাশের নামে। সেই মামলায় ২০ দিন জেল খেটে সে জামিন পেয়েছিল। তিনি বলেন, গতরাত ১টার দিকে সোনারগাঁ থানা পুলিশ আমাদের বাসায় আসে এবং বাড়ি তল্লাশি করে। পরে আমি ও আমার স্ত্রীকে স্থানীয় এক মুরুব্বির জিম্মায় রেখে যায় তারা। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে পলাশ ছোট। একমাত্র ছেলে হওয়ায় যা চাইতো তাই দেওয়ার চেষ্টা করতাম। কিন্তু ছোটবেলা থেকে পলাশ অবাধ্য সন্তান ছিল বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তার বাবা। ছিনতাইয়ের চেষ্টা করা বাংলাদেশ বিমানের ময়ূরপঙ্খি উড়োজাহাজের (বিজি-১৪৭ ফ্লাইট) যাত্রী তালিকায় তার নাম উল্লেখ ছিল AHMED/MD POLASH। সিট নম্বর ১৭এ। পলাশ আহমেদ ঢাকা-চট্টগ্রাম অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রী ছিল। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান গণমাধ্যমকে জানান, নিহত ওই যুবক ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে বিমানে চড়েন চট্টগ্রামে যাওয়ার উদ্দেশে। চট্টগ্রাম হয়ে দুবাই যাওয়ার কথা ছিল ওই বিমানটি। ক্রিমিনাল ডাটাবেজ থেকে পলাশের পরিচয় শনাক্তের কথা বললেও ঠিক কী ধরনের অপরাধের জন্য তার নাম র‌্যাবের ক্রিমিনাল ডেটাবেজে যুক্ত করা হয়েছিল, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেননি এ মুফতি মাহমুদ। এর আগে রোববার রাতে ওই যুবকের পরিচয় নিয়ে একাধিক তথ্য জানানো হয়, যা নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়। প্রথমে বলা হয় তার নাম মাহাদী। পরে বলা হয় মো. মাজিদুল। তবে টিকিটে তার নাম মো. মাজিদুল লেখা ছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়। কিন্তু আজ যে তথ্য এলো তাদের দেখা যাচ্ছে তার নাম মাহাদী ও মাজিদুল কোনোটিই নয়; তার নাম পলাশ। গুলিতে নিহত হওয়ার সময় যুবকের নাম মাহাদী বলে জানান চট্টগ্রাম ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মতিউর রহমান। রোববার রাত পৌনে ৯টার দিকে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয় ওই যুবকের নাম মাজিদুল। প্রসঙ্গত বাংলাদেশ বিমানের দুবাইগামী একটি উড়োজাহাজ ছিনতাইয়ের চেষ্টা পাইলট-ক্রুদের তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তা ও যৌথবাহিনীর অভিযানে ব্যর্থ হয়েছে। রোববার বিকালে হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার পর মধ্যাকাশে এ ঘটনা ঘটে। এর পর অত্যন্ত সুকৌশলে ককপিটের দরজা বন্ধ করে বিমানটিকে শাহ আমানত বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করেন পাইলট। সেখানে উদ্ধার অভিযানের সময় উড়োজাহাজে থাকা অস্ত্রধারী ছিনতাইকারীকে আহতাবস্থায় আটক করা হয়। পরে তার মৃত্যু ঘটে। এর আগে বিমানটির যাত্রী-ক্রুসহ সবাইকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়। বিমানের একজন পরিচালক জানান, বিজি-১৪৭ নম্বর ফ্লাইটটি রোববার বিকাল সাড়ে ৪টায় ঢাকা থেকে ছেড়ে চট্টগ্রাম হয়ে দুবাই যাওয়ার সিডিউল ছিল। এতে ১৩৪ যাত্রী ও ১৪ ক্রুসহ ১৪৮ জন ছিলেন। ফ্লাইটের ককপিটে ছিলেন ক্যাপ্টেন শফিউল ও ফার্স্ট অফিসার মুনতাসির। কেবিন ক্রু ছিলেন নিম্মি, হুসনে আরা, সাগর, সাকুর ও বিথী। ওই ফ্লাইটটি হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে টেকঅফ করার পর পরই ককপিটে বসে ক্যাপ্টেন শফিউল ও ফার্স্ট অফিসার মুনতাসির কোনোভাবে আঁচ করতে পারেন ভেতরে যাত্রীবেশে সন্ত্রাসী ঘাপটি মেরে আছে। এর পরই পাইলট শাহ আমানতের টাওয়ারের কাছে জরুরি অবতরণের মেসেজ পাঠান। অত্যন্ত সুকৌশলে তিনি ফ্লাইটটি ল্যান্ড করার পর দ্রুত যাত্রীদের নিয়ে বের হয়ে আসতে সক্ষম হন। একটি সূত্র জানায়, ওই ফ্লাইটটি টেকঅফের পর পরই নিহত ব্যক্তি যাত্রী ককপিটে গিয়ে পাইলটের সঙ্গে কথা বলতে চান। তাকে সে সুযোগ দেয়া হলে সে ক্যাপ্টেনকে জানায়- জরুরিভাবে এখনই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে হবে। এর পরই ক্যাপ্টেন কৌশলে জরুরি অবতরণের মেসেজ পাঠান টাওয়ারে। বিকাল ৫টা ৪১ মিনিটে ফ্লাইটটি শাহ আমানতে অবতরণের সঙ্গে সঙ্গেই কেবিন ক্রুরা পেছনের জরুরি নির্গমনের দরজা দিয়ে একে একে সব যাত্রীকে বের করে আনেন। এদিকে ককপিটে আলোচনারছলে ক্যাপ্টেন ওই অস্ত্রধারীকে রেখেই বের হয়ে আসতে সক্ষম হন। ভেতরে তখন ছিলেন কেবিন ক্রু সাগর। এদিকে খবর পেয়ে চট্টগ্রাম বিমানবাহিনী ঘাঁটির অধিনায়ক এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমানের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী, র‌্যাবসহ অন্যান্য নিরাপত্তারক্ষীদের যৌথ অভিযানের প্রস্তুতি নেয়া হয়। তারা গ্রাউন্ড থেকে ফোনে অস্ত্রধারীর সঙ্গে কথা বলতে থাকেন। তাকে ফোনে কথা বলায় ব্যস্ত রেখে হঠাৎ একপর্যায়ে ফ্লাইটের ভেতরে পৌঁছে যান নিরাপত্তারক্ষীরা। তারা ওই অস্ত্রধারীকে জাপটে ধরে বের করে আনেন। পুলিশের বিশেষ শাখার ডিআইজি আকমল হোসেন বলেন, ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়ার পর অস্ত্রধারী ককপিটে ঢুকে পাইলটকে পিস্তল ধরে বলেন, আমাকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলিয়ে দিতে হবে। পাইলট ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে চট্টগ্রামে অবতরণ করান। ওই বিমানের যাত্রী সংসদ সদস্য মাঈনউদ্দিন খান বাদল গণমাধ্যমকে বলেন, পাইলট আমার সঙ্গে নেমে এসেছিলেন। তিনি বলেছেন- তাকে পারসু করার চেষ্টা করেছে হাইজ্যাকার, বলছে সে শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলতে চায়। একজন প্রত্যক্ষদর্শী ক্রু জানান, সাড়ে ৪টার কিছু সময় পর ময়ূরপপঙ্খি (বিজি-১৪৭) আকাশে প্রায় ১৫ হাজার ফুট ওপরের দিকে উড়ে যাচ্ছিল। তখন উড়োজাহাজের ভেতরে যাত্রীদের আসনে থাকা এক ব্যক্তি উঠে ককপিটের দিকে আসেন। এ সময় ওই ব্যক্তি এক ক্রুর কাছে যান। কাছে গিয়ে তিনি ওই ক্রুকে ধাক্কা দেন এবং সঙ্গে সঙ্গে একটি পিস্তল ও বোমাসদৃশ একটি বস্তু বের করে বলেন, ‘আমি বিমানটি ছিনতাই করব। আমার কাছে পিস্তল ও বোমা আছে। ককপিট না খুললে আমি বিমান উড়িয়ে দেব।’ এর মধ্যে অন্য কেবিন ক্রুরা ককপিটে থাকা পাইলট ও সহকারী পাইলটকে গোপনে সাংকেতিক বার্তা দেন যে, উড়োজাহাজে অস্ত্রধারী আছে, উড়োজাহাজ ছিনতাইয়ের চেষ্টা হচ্ছে। ঠিক এ সময় উড়োজাহাজটি চট্টগ্রাম ও ঢাকার মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থান করছিল। তিনি বলেন, পাইলট মো. শফি ও সহকারী পাইলট মো. জাহাঙ্গীর কৌশলে সফলভাবে জরুরি অবতরণ করেন। এ সময় চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে ছিলেন ওমানগামী ফ্লাইটের যাত্রী কাউছার। তিনি জানান, ছিনতাইয়ের কবলে থাকা বিমানটি যখন অবতরণ করে, তখন তারা দ্বিতীয়তলায় ছিলেন। পৌনে ৬টার দিকে বিমানটি জরুরি অবতরণ করে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমানবন্দরের অফিস স্টাফদের বিমানটির কাছে ছুটে যেতে দেখেন। তিনি আরও বলেন, প্রথম দিকে যখন হুড়োহুড়ি শুরু হয়, তখন আমিসহ অনেকেই নিচতলায় নেমে আসি। এ সময় ওই বিমানের কয়েকজন যাত্রী বিমানে গুলির ঘটনা ঘটেছে বলে জানান।

বিশেষ প্রতিবেদন এর আরো খবর