চালু হলো বন্দিদের ফোনালাপের সুযোগ

চুয়াডাঙ্গার রাশেদুল ইসলাম একটি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে টাঙ্গাইল জেলা কারাগারে আছেন। এত দূর থেকে স্বজনদের এসে দেখা করা ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য। তাই খুব একটা দেখা হয় না স্বজনদের সঙ্গে। কারাগারে একাকিত্ব সময় কাটান তিনি। রাশেদুল বুধবার কারাগার থেকে মোবাইল ফোনে স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন। আর তার কথা বলার মধ্য দিয়েই দেশে প্রথম চালু হলো স্বজনদের সঙ্গে কারাবন্দিদের ফোনে কথা বলার কার্যক্রম। বুধবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল প্রধান অতিথি হিসেবে টাঙ্গাইল কারাগারে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। ‘স্বজনের সাথে সংশোধনের পথে’ স্লোগানকে সামনে নিয়ে টেলিফোনে কথা বলা এই কার্যক্রমের নামকরণ করা হয়েছে ‘ স্বজন পরিবারের বন্ধন।’ উদ্বোধনী দিনে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলতে পেরে বন্দিরা খুব খুশি। তাদের বক্তব্য এ উদ্যোগের ফলে তাদের কারাজীবনের একাকিত্ব কিছুটা হলেও কমবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র সচিব (সুরক্ষা বিভাগ) ফরিদ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল্লাহ আল মামুন, আইজি প্রিজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন, এটুআই প্রকল্পের পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। উদ্বোধনের পর ৩০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত মধুপুরের লাভলু মণ্ডল ফোনে কথা বলেন তার মায়ের সঙ্গে। লাভলু দুই বছর ধরে কারাগারে আছেন। ইচ্ছে থাকলেও বৃদ্ধ মা ছেলেকে দেখতে আসতে পারেন না। এই কার্যক্রম চালু হওয়ায় লাভলু এবং তার মা দুজনেই খুব খুশি। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত টাঙ্গাইল সদর উপজেলার চাকতা গ্রামের শাহাদত হোসেন স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। সন্তানদের খোঁজখবর নেন। পরে তিনি বলেন, ‘এখন মাঝে মাঝে ফোনে স্ত্রী, সন্তানদের সঙ্গে কথা বলা যাবে। তাদের খোঁজখবর রাখা যাবে। এতে বন্দি জীবনে কিছুটা হলেও শান্তি পাব।’ আইজি প্রিজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন জানান, বন্দিরা পরিবার-পরিজন নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। এতে মানসিক বিষন্নতা দেখা দেয়। টেলিফোনে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলায় তাদের বিষণ্ণতা অনেকটাই লাঘব হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান জানান, টাঙ্গাইল কারাগারে এই কার্যক্রম সফল হলে পর্যায়ক্রমে দেশের সব কারাগারে বন্দিদের ফোনে কথা বলার এ কার্যক্রম চালু করার ব্যবস্থা করা হবে। জেলা কারাগার সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) এর সার্ভিস ইনোভেশন ফান্ড ও বাংলাদেশ জেল এর সহায়তায় এ কার্যক্রম শুরু হলো। এর আওতায় বন্দিরা (হাজতি ও কয়েদি) কারাগারে আসার পর তাদের কাছ থেকে তাদের স্বজনদের দুটি মুঠোফোন নম্বর রাখা হবে। মাসে একজন বন্দি দুবার ১০ মিনিট করে কথা বলার সুযোগ পাবেন। কথা বলার ক্ষেত্রে নারী, বৃদ্ধ ও বন্দিদের সঙ্গে আসা শিশুদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। সরেজমিন টাঙ্গাইল কারাগারে গিয়ে দেখা যায়, কারাগারের ভেতর একটি কক্ষে চারটি ফোন বুথ তৈরি করা হয়েছে। জেলার আবুল বাশার জানান, কোনো বন্দি বুথে গিয়ে সরাসরি কল করতে পারবেন না। নির্ধারিত সময়ে বন্দিরা বুথে ঢুকে এক বা দুই চাপলে সফটওয়্যার থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অভীষ্ট নম্বরে সংযোগ পাওয়া যাবে। নির্ধারিত সময় ১০ মিনিট পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে কল কেটে যাবে। সময় শেষ হওয়ার তিন মিনিট আগে সতর্কসূচক ‘বিপ’শব্দ হবে। নির্ধারিত সময়ের পূর্বে বা পরে কল ডায়াল হবে না। শুধুমাত্র নির্ধারিত সময়েই কল করতে হবে। বন্দিদের স্বজনরা নির্ধারিত সময়ে যাতে কথা বলার জন্য প্রস্তুত থাকতে পারেন, সে জন্য আগের দিন তাদের মুঠোফোনে ক্ষুদেবার্তা পাঠিয়ে সময় জানিয়ে দেয়া হবে বলে তিনি জানান। এটুআই প্রকল্পের পরামর্শক তানভীর কাদেরের নেতৃত্বে কারাগারে ফোন বুথ ও এর সফটওয়্যার প্রস্তুত করা হয়েছে। তানভীর কাদের জানান, কারাগারের যেসব কর্মী এই কার্যক্রমে যুক্ত থাকবেন। তাদের পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। টাঙ্গাইলের জেলা সুপার মঞ্জুর হোসেন জানান, বন্দিরা কারাগার থেকে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কথা বলতে পারলে তাদের পারিবারিক যোগাযোগ অক্ষুণ্ণ থাকবে। তিনি জানান, বন্দিদের মধ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী, জঙ্গি, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সদস্য এবং অপহরণ ও চাঁদাবাজির মামলায় অভিযুক্ত বন্দিরা ফোনে কথা বলার সুযোগ পাবেন না। নিরাপত্তার স্বার্থে বন্দিদের প্রতিটি কল রেকর্ড করা হবে। এছাড়া বুথে সার্বক্ষণিক কারারক্ষী নিয়োজিত থাকবে।
 

বিশেষ প্রতিবেদন এর আরো খবর