আজ পবিত্র ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী

 পবিত্র ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী (সা) আজ। মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা)-এর জন্ম ও ওফাত দিবস। মানবতার মহান এই মুক্তির দূত আজ থেকে ১৪শ’ ৩০ বছর আগে মক্কার কুরাইশ বংশে মা আমেনার গর্ভে জন্ম নেন। তাঁর জন্মের সময় পুরো আরব হেজাজ ছিল অন্ধকার এবং কুসংস্কারে নিমজ্জিত। জাহেলি ওই সমাজে গোত্রে গোত্রে যুদ্ধ, হত্যা, খুন, মারামারি ছিল নিত্য বিষয়। নারীদের ছিল না কোন মর্যাদা। কন্যা শিশুকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো। সেই সমাজে দাঁড়িয়ে তিনি একা সত্যের অমিয় বাণী প্রচার করে বিশ্বে আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন।
 
মাত্র ২৩ বছরের সংগ্রাম ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে জাহেলি প্রথা দূর করে পুরো আরব হেজাজে একটি আলোকিত সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। আজ তাই বিশ্বের ১শ’ ৬০ কোটি মানুষের অনুকরণীয় বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এ দিনে বিশ্বের মুসলমানরা পরম শ্রদ্ধা ও সম্মানের সঙ্গে তাদের প্রিয় নবীকে স্মরণ করবে। কণ্ঠে ধ্বনিত হবে বালাগাল উলা বেকামালিহি, কাশাফদ্দোজা বেজামালিহি, হাসুনাত জামিয়ু খিসালিহি, সাল্লু আলায়হে ওয়া আলিহি। পবিত্র ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম রওশন এরশাদ পৃথক বাণী দিয়েছেন। দিনটি উদ্যাপন করার জন্য বিভিন্ন ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন কর্মসূঈ গ্রহণ করেছে।
 
মহানবী (সা) এমন এক সমাজে জন্ম গ্রহণ করেন, যে সমাজে লোকজন মহান সৃষ্টিকর্তাকে ভুলে পৌত্তলিকতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। মারামারি হানাহানি ছিল নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। সেই সমাজের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে তিনি প্রথমে একাই লড়াই করেছেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন ইনসাফ বা ন্যায়ভিক্তিক সমাজ ব্যবস্থা। কিন্তু অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করে যে আলোর পথ তিনি দেখিয়েছেন তা সহজ কাজ ছিল না। বৈরী পরিবেশে প্রচ- প্রতিকূলতার মধ্যে তাকে লড়াই করতে হয়েছিল। এ কারণে অনেক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত সমস্ত বৈরী মানসিকতাকে পরাজিত করেই সত্যের পক্ষে বিজয় লাভে সক্ষম হন।
 
মহানবী (সা) ছোটকাল থেকে সমাজে সবার কাছে সত্যবাদী বা আল-আমিন বলে পরিচিত ছিলেন। নবুয়াত প্রাপ্তির আগে তিনি সবার কাছে ছিলেন বিশ্বাসী ও প্রিয়পাত্র। কিন্তু নবুয়াত প্রাপ্তির পর থেকেই শত্রুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ফলে যে মক্কায় তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা সেখানে তিনি বেশিদিন সত্যের বাণী প্রচার করতে পারেননি। সমাজের নিয়ন্ত্রণকারীরা দিন দিন তার বিরুদ্ধাচরণ ও হত্যার ষড়যন্ত্র শুরু করে। ফলে প্রিয় জন্মভূমি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। মদিনায় গিয়ে সেখান থেকেই আল্লাহর একত্ববাদী ধর্ম প্রচার করতে থাকেন। ২৩ বছরের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও সাধনায় পুরো আরব সমাজে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। দূর করেন জাহেলি যুগের সব ইসলামবিরোধী প্রথা। অক্লান্ত পরিশ্রম ও চেষ্টার মাধ্যমে বৈরী সমাজকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। একদিন যেখান থেকে তিনি বিতাড়িত হয়েছিলেন, কোন ধরনের রক্তপাত ছাড়াই বিনা বাধায় তিনি সেই মক্কা বিজয় করেন। বিদায় হজের ভাষণে তিনি ঘোষণা দেন আজ এই মক্কা শহর যেমন পবিত্র, জিলহজ মাস যেমন পবিত্র, তেমনই পবিত্র মানুষের জীবন, সম্পদ ও তাদের মর্যাদা। এছাড়া মহানবী (সা) বলেন, যতদিন মানুষ আল্লাহর বাণী কোরান এবং তার রাসুলের সুন্নাহ অনুসরণে করবে ততদিন বিপথে চালিত হবে না।
 
বিদায় হজের ভাষণে তিনি বলেন, আজ থেকে অনারবের ওপর আরবের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তেমনি শ্রেষ্ঠত্ব নেই কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর অকৃষ্ণাঙ্গদের। কোন হাবশি কৃতদাসও যদি তোমাদের নেতা হয় তাকেও মেনে নেবে। এর মাধ্যমে তিনি মানবতার এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠা করেন বিশ্বের বুকে। সর্বকালের এই সর্বশ্রেষ্ঠ মানব ৫৭০ সালে মক্কার কুরাইশ বংশে জন্ম গ্রহণ করেন। জন্মের ৬ মাস আগে পিতা আব্দুল্লাহ এবং ৬ বছর বয়সে মাতা আমেনার মৃত্যু হয়। আরবের প্রথা অনুযায়ী দুধমাতা হালিমার কাছে দীর্ঘ সময় লালিত-পালিত হন। পিতা-মাতা মারা যাওয়ার পর তিনি দাদা আব্দুল মুত্তালিবের কাছে বড় হন। শেষ পর্যন্ত দাদা মারা গেলে চাচা আবু তালিব নবীর কিশোর বয়সে দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করেন। ২৫ বছর বয়সে মক্কার ধনাঢ্য বাবসায়ী খাজিদার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। পরিণত বয়সে তিনি প্রায়ই হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। তাঁর বয়স যখন ৪০ বছর তখন ফেরেস্তা জিবরাইল (আ)-এর মাধ্যমে নবুয়াত প্রাপ্তির সুসংবাদ পান। ধ্যানে মগ্ন থাকাকালে ফেরেস্তার মাধ্যমে তিনি প্রথম বাণী শ্রবণ করেছিলেন; হে নবী পড় তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন এক ফোঁটা রক্তবিন্দু থেকে। আর শিক্ষা দিয়েছে কলমের দ্বারা। আর এভাবেই তাঁর ওপর অবতীর্ণ হয় সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মগ্রন্থ কোরান মাজিদ। যা মুসলমানদের একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান।
 
হযরত মুহম্মদ (সা)কে প্রেরণ করা হয়েছিল সমগ্র মানবজাতির রহমত স্বরূপ। তাঁর আগমনে মানব জাতি লাভ করেছে কল্যাণময় পথের পরিপূর্ণ দিকনির্দেশনা, মানবিক মূল্যবোধ ও মর্যাদার গভীরতম চেতনা। ৬৩২ সালে দীর্ঘ ৬২ বছর বয়সে আজকের এইদিনে তিনি পৃথিবী থেকে চির বিদায় নেন।
 
এদিকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে এ উপলক্ষে পক্ষকালব্যাপী বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ১৫ দিনব্যাপী ওয়াজ ও মিলাদ মাহফিল, ইসলামী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, সেমিনার, কিরাত মাহফিল, হামদ-নাত ও স্বরচিত কবিতা পাঠের আসরের আয়োজন করেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। বৃহস্পতিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
 
এতে বলা হয় বাংলাদেশ বেতারের সঙ্গে যৌথ প্রযোজনায় সপ্তাহব্যাপী মহানবী (সা)-এর জীবন ও কর্মের ওপর সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সম্মেলন কক্ষে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে সীমিতসংখ্যক দর্শকের উপস্থিতিতে এ আয়োজন করা হয়েছে। স্কুল-কলেজ, আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণে জুম এ্যাপের মাধ্যমে ইসলামী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিযোগিতার বিষয় কিরাত, হামদ-নাত, উপস্থিত বক্তৃতা ও জুমার খুতবা লিখন। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সম্মেলন কক্ষে জুম এ্যাপের মাধ্যমে কিরাত মাহফিল, হামদ-নাত ও স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর আয়োজন করা হয়েছে। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি কমপ্লেক্সে পবিত্র ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী (সা) উপলক্ষে পবিত্র কোরানখানি এবং দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়াও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সব বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয়, ৫০টি ইসলামিক মিশন ও সাতটি ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমিতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে।
 
এদিকে মহাপবিত্র ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী (সা) উপলক্ষে জাকের পার্টির উদ্যোগে দেশজুড়ে দুই দিনব্যাপী নানা কর্মসূচী পালিত হবে। এর মধ্যে রয়েছে ইসলামী জলসা, মিলাদ মাহফিল, নফল ইবাদত বন্দেগি, ঘরে ঘরে আল্লাহু আকবার ও কলেমা শরিফ খচিত পতাকা এবং জাকের পার্টির পতাকাসহ তিনটি পতাকা উত্তোলন, বর্ণাঢ্য র‌্যালি, বৃক্ষরোপণ, পারিবারিক ও সামাজিক উদ্যোগসহ নানা আয়োজন। করোনাকালীন স্বাস্থ্যবিধি মেনে এসব অনুষ্ঠানে দেশ ও জাতির জন্য মহান আল্লাহ তায়ালার রহমত কামনা, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, সৌভ্রাতৃত্ব ও সংহতি এবং সর্বোপরি শান্তিকামী বিশ্ব মানবতার কল্যাণ কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হবে। আজ শুক্রবার বাদ জুমা দেশব্যাপী মহানগর ও জেলা পর্যায়ে থানা এবং উপজেলাভিত্তিক বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের করা হবে।