গণসংবর্ধনায় শেখ হাসিনা
নৌকা ঠেকিয়ে কি যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমতায় আনবেন?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নৌকায় ভোট দিয়েছে বলে জনগণ ভাষার অধিকার পেয়েছে। দেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। দেশের উন্নয়ন হয়েছে। স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে নাম লিখিয়েছে। পারমাণবিক ও স্যাটেলাইট যুগে প্রবেশ করেছে।
 
শনিবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তাকে দেয়া গণসংবর্ধনায় তিনি এসব কথা বলেন।
 
নৌকা ঠেকাতে একটি মহল তৎপর রয়েছে বলে অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নৌকা কেন ঠেকাতে হবে? নৌকার অপরাধ কী? সামনে শ্রাবণ মাস। বর্ষার সময়, বন্যার সময়। নৌকা তো লাগবে। যেসব রাজনীতিক নৌকা ঠেকাতে নেমেছেন, বন্যার সময় রিলিফ বিতরণ করতে ও চলাচল করতেও তো তাদের নৌকাই লাগবে। নৌকা ঠেকিয়ে কি রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমতায় আনবেন? যারা স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, তাদের মুখে এ কথা মানায় না।
 
শেখ হাসিনা বলেন, আমরাই নির্বাচনে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স এনেছি। স্থানীয় ও জাতীয়সহ এ পর্যন্ত যতগুলো নির্বাচন হয়েছে তার সব কটিতে জনগণ ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেছে। গণতন্ত্র যদি না থাকে তবে জনগণ ভোট দিয়েছে কীভাবে?
 
মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, গ্লোবাল উইমেন’স লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড, কলকাতা থেকে ডি-লিট উপাধি পাওয়াসহ নানা সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে দলের সভাপতিকে এ গণসংবর্ধনা দেয় আওয়ামী লীগ।
 
বিশিষ্ট নাগরিকদের উপস্থিতিতে অভিনন্দনপত্র পাঠ করে নাচে-গানে উৎসবমুখর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে এ সম্মান দেয় তার দল।
 
অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার লক্ষ্যে বেলা সাড়ে ৩টায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে পৌঁছান তিনি।
 
এরপর বিকাল ৪টা ৪২ মিনিটে ভাষণ দিতে ওঠেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। লোকে লোকারণ্য উদ্যানে শেখ হাসিনা মঞ্চে উঠতেই স্লোগানে আর হর্ষধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে ঐতিহাসিক এ স্থান।
 
আধা ঘণ্টার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার বক্তব্যের পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অভিনন্দনপত্র পাঠ করেন।
 
এরপর অভিনন্দনপত্রটি তিনি প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন।
 
বক্তৃতা দিতে দাঁড়িয়ে শুরুতেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান উদ্ধৃত করে শেখ হাসিনা বলেন, এ মনিহার আমায় নাহি সাজে...।
 
তিনি বলেন, জনগণ কতটুকু পেল, সেটাই আমার কাছে সব থেকে বিবেচ্য বিষয়। এর বাইরে আমার আর কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের পর কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলা ও দল গোছানো এবং বাংলার মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনার কথা তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।
 
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিজের পথচলার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, জাতির পিতা বলেছিলেন বাংলার মানুষ যেন অন্ন পায়, বস্ত্র পায়, বাসস্থান পায়, শিক্ষা পায়, উন্নত জীবন পায় জাতির পিতার সেই স্বপ্নপূরণ করাই আমার লক্ষ্য।
 
সংবর্ধনাকে বাংলার জনগণকে উৎসর্গ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করাই আমার একমাত্র লক্ষ্য। আজ গণসংবর্ধনার কোনো প্রয়োজন নেই।
 
তিনি বলেন, সংবর্ধনা উৎসর্গ করছি বাংলাদেশের মানুষকে। আমার জীবনের একটাই লক্ষ্য বাংলাদেশের মানুষের জীবনমান উন্নত করা, সুন্দর জীবন উপহার দেয়া। সেটা শুধু বিত্তশালীদের জন্যই নয়; একেবারে গ্রাম পর্যায়ের মানুষের উন্নতিও।
 
তিনি বলেন, আমার রাজনীতি বঞ্চিত মানুষের জন্য। যেদিন তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারব। সেদিন নিজেকে সার্থক মনে করব। তিনি বলেন, আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না, মরার আগে মরতে রাজি না। যতক্ষণ বেঁচে থাকব দেশের জন্য কাজ করে যাব।
 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার নিজের জীবনযাত্রার কথা তুলে ধরে বলেন, আমি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিজের জন্য মাত্র ৫ ঘণ্টা সময় ব্যয় করি। কোনো উৎসবে আমি যাই না। প্রতিটি মুহূর্ত কাজ করি দেশের মানুষের জন্য। মৃত্যুভয় আমি করি না। মৃত্যুর আগে মরতেও রাজি নই। যতক্ষণ জীবন আছে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য কাজ করে যাব। যে মানুষের জন্য আমার বাবা সারা জীবন সংগ্রাম করে গেছেন। বেহেশত থেকে আমার বাবা তা দেখবেন।
 
জনগণের ভাগ্য নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেলবে, তা বরদাস্ত করব না এমন মন্তব্য করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। এগিয়ে যাওয়ার ধারা আমরা যাতে অব্যাহত রাখতে পারি।
 
তিনি বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে প্রবেশ করায় একটি মহল সমালোচনায় মেতেছে। যারা এটাকে সন্দেহের চোখে দেখে, সমালোচনা করে তাদের সম্পর্কে আমার মনে হয়, তারা দেশের স্বাধীনতা ও অস্তিত্ব স্বীকার করে না।
 
বিএনপির সমালোচনা করে সরকারপ্রধান বলেন, আমরা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে গণমুখী কাজ শুরু করি। বিএনপি ক্ষমতায় এসে সেগুলো বন্ধ করে দেয়। আমরা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে আবার তা শুরু করি। বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। আমাদের লক্ষ্য বাংলাদেশের উন্নয়ন।
 
 
 
দেশের সব অর্জন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েই হয়েছে দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই দেশের জনগণ কিছু পায়, দেশের উন্নয়ন হয়। ২১ বছর এ দেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়েছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরই দেশের উন্নয়ন হয়েছে।
 
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার জাতির পিতা শুরু করেছিলেন। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে সেই বিচার বন্ধ করে দিয়েছিল। যুদ্ধাপরাধীদের সরকারের উচ্চপদে চাকরি দিয়েছিল। আমরা ট্রাইব্যুনাল করে সেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে পেরেছি। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ কলুষমুক্ত হয়েছে। এ অপরাধীদের যখন আমরা বিচারের মুখোমুখি করতে পেরেছি তখনই যেন আমাদের উন্নয়নের দ্বার খুলে যায়; এটাই আমার উপলব্ধি।
 
নৌকায় ভোট দিলেই দেশের উন্নয়ন হয় এমন মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরে বলেন, মানুষ নৌকায় ভোট দিয়েছে বলেই দেশে দারিদ্র্যের হার ২২ ভাগে নেমে এসেছে। আমরা এটা আরও কমাতে পারব ইনশাআল্লাহ।
 
বিকাল ৪টা ১৯ মিনিটের দিকে সংবর্ধনার মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। তার আগে দলের সাংস্কৃতিক উপকমিটির পক্ষ থেকে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা হয়।
 
এ পর্ব উপস্থাপনা করেন আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হাছান মাহমুদ এবং উপপ্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন।
 
সংবর্ধনা অনুষ্ঠান মঞ্চে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়রসহ ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা উপস্থিত ছিলেন।
 
আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে ১৪ দলের শরিক নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। রাজধানীর আশপাশের কয়েক লাখ মানুষের পদচারণায় জনসমুদ্রে পরিণত হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। সকাল থেকেই আসতে শুরু করে মানুষ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের স্রোতধারা বাড়তে থাকে। প্রধানমন্ত্রী আসার আগেই পূর্ণ হয়ে উঠে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান।
 
এদিন প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমার কাজে যারা সহযোগিতা করেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে যারা প্রতিনিয়ত আমার প্রত্যেকটি কাজ সুন্দরভাবে সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করেছেন, তাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
 
সবার সহযোগিতা না পেলে আজকে বাংলাদেশের এ এগিয়ে চলা সম্ভব হতো না মন্তব্য করে তিনি বলেন, আজকে বাংলাদেশ যে উন্নয়নশীল দেশ, তার যে উন্নত হওয়া, তা কখনো সম্ভব হতো না।
 
 
 
আবহমান বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের আলোকেই সংবর্ধনা : আবহমান বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের আলোকেই প্রধানমন্ত্রীকে এ সংবর্ধনা দেয়া হয়। শেখ হাসিনার আগমনের পূর্বেই সংবর্ধনামঞ্চে চলে বাঙালির চির চেনা গান। গান গেয়ে শোনান মমতাজ, এসডি রুবেল, সালমা প্রমুখ।
 
প্রধানমন্ত্রীর গণসংবর্ধণা অনুষ্ঠানে নিজ নিজ অঙ্গনের প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরা হাজির হন মঞ্চে। বাঙালি সংস্কৃতির প্রিয় সতীর্থ লালনের গান নিয়ে আসে সালমা। লোকায়ত চিন্তার গান পরিবেশন করেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ইন্দ্রমোহন রাজবংশী।
 
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার কন্যা শেখ হাসিনাকে নিয়ে শিল্পী শুভ্রদেব ও এসডি রুবেল পৃথক পৃথকভাবে গেয়েছেন স্ব-রচিত গান।
 
বেলা সাড়ে ৩টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মঞ্চে আসন গ্রহণের পূর্বেই জানানো হয় প্রধানমন্ত্রী আসলে গান পরিবেশন করবেন মমতাজ। যথারীতি অনুষ্ঠানের মধ্যমণি শেখ হাসিনা মঞ্চের কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গে মমতাজ গাইতে শুরু করলেন।
 
দেশের উন্নয়ন ও সফলতায় শেখ হাসিনার ভূমিকা শাহ আলমের লেখা একটি গান পরিবেশন করেন মমতাজ। প্রধানমন্ত্রীর আসন গ্রহণের পর মমতাজ গাইলেন আরও দুটি গান।
 
প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে বাংলার আদিম সংস্কৃতির সঙ্গে বর্তমান গ্রামীণ ও নগর জীবনের মিশ্রণ ঘটিয়ে পরিবেশিত হয় গীতিনৃত্যনাট্য ‘আমার প্রিয় বাংলাদেশ’।
 
দেশের শতাধিক প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পী এ পরিবেশনায় অংশ নেয়। এরপর সঙ্গীতশিল্পী বাপ্পা মজুমদার ও সামিনা চৌধুরীসহ পঞ্চাশের অধিক শিল্পীর সমাবেত গানের সঙ্গে অর্থবহ আলোছায়ার চমৎকার খেলা উপস্থিত দর্শক স্রোতাকে বিমোহিত করে।
 
অন্যদিকে মঞ্চের প্রবেশদ্বারে প্রখ্যাত শিল্পী হাশেম খানসহ দেশের প্রথিতযশা শিল্পীদের আঁকা প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন সময়ের ও বিভিন্ন পরিস্থিতির ছবি অনুষ্ঠানস্থলে প্রদর্শিত হয়।
 
গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দলেরন প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংসদ উপনেতা সাজেদা চৌধুরী। এতে প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়সহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

রাজনীতি এর আরো খবর