সন্তানের বয়ঃসন্ধিকাল এক বিপদজনক সময়
বাচ্চার প্রশ্নের ঠিক ঠিক উত্তর দিতে শিখুন
সাঈদা মিমি :

কথা বলতে শেখা থেকে সন্তানের প্রথম প্রশ্ন হয়তো এরকম থাকে, ‘আমি কিভাবে হলাম মা?’ কি দেবেন এর উত্তর? সন্তানের বয়ঃসন্ধিকাল এক বিপদজনক সময়। নিষিদ্ধকে জানার আগ্রহে ওরা বহির্মূখি হয়ে যায়। তাহলে? কিভাবে জানবে ওরা এই বিষয়ে? সত্যগুলো আসলে বাবা মার কাছ থেকে শেখাই উচিত। স্কুল, কলেজের মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও সেক্স এডুকেশন এর বিষয়ে দায়িত্ব বর্তায়। প্রাককথন : আপনার সন্তান বয়ঃসন্ধিতে পা দিয়েছে? ওকে খুব অচেনা লাগছে আজকাল? এড়িয়ে আপনাকে? ওর আচরণ আপনাকে অবাক বা আহত করছে? আপনি স্থবির, কিছুই কি করার নেই আপনার! আবার বড় হয়ে গেছে ওরা। মেয়ে সন্তান হলে তার শারীরিক পরিবর্তনে নতুন কিছু যোগ হবে, যেমন, কিভাবে বলবেন মেয়োকে এসব? শেখাবেন? সামাজ়িক নিয়ম কানুন আর মেয়েদের চলাফেরায় নানা প্রতিবন্ধকতার বিষয়ে ওকে বোঝাবেন কিভাবে? জ়রুরি বিষয়টা হচ্ছে সেক্স এডেুকেশন বা যৌনশিক্ষা। এই শিক্ষার সবচেয়ে সুন্দর আর আদর্শ নাম হতে পারে ‘ ফ্যামিলি লাইফ এডুকেশন ‘। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই নামটিই চলে। বাংলায় বলা যায়, ‘পারিবারিক জীবনের শিক্ষা’। ভয়ের কিছু নেই, সেক্স ম্যানুয়াল পড়ে শেখাতে বলা হচ্ছে না আপনার সন্তানকে। শুধুমাত্র জেনে বুঝে নিতে বলা হচ্ছে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যৌনতার বিজ্ঞান আর মনস্তত্বকে। পাশ্চাত্বে আকছার যৌন শিক্ষা দেয়া হচ্ছে স্কুল গুলোতে। প্রাচ্যের আমরা এক্ষেত্রে পিছিয়ে আছি বটে। আশার কথা হলো, একটু দেরিতে হলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ মেনে মানব প্রজনন আর এ সংক্রান্ত শিক্ষার পরিকল্পনা এদেশেও নেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বাচ্চার প্রশ্নের ঠিক ঠিক উত্তর দিতে শিখুন : মাঝে মাঝে বাচ্চারা জন্মরহস্য নিয়ে নানা প্রশ্ন করবেই। ওদের চুপ করিয়ে দেবেন না। এরকম প্রশ্নের উত্তর হবে বিজ্ঞানসম্মত ও বাস্তবমুখি। ঘাবড়ে যাবেন না, ফিসফিস করে বলবেন না। ছেলেমেয়েদের এরকম প্রশ্নের উত্তর দিন সহজ সরলভাবে, গল্পচ্ছলে। বাচ্চা যেন না ভাবে, ব্যাপারটায় আপনি অতিরিক্ত গুরুত্ব দিচ্ছেন বা কিছু লুকাচ্ছেন। ‘আগে বড় হও, পরে জানতে পারবে। এসব জানার জন্য তুনি খুব ছোট’- এরকম দায়সারা উত্তর বাচ্চার জন্য ক্ষতিকর। উত্তরটা জানা না থাকলে বাচ্চাকে বলুন, বাঃ, তুমি বেশ ভালো প্রশ্ন করেছ। এর উত্তরটা কিভাবে বোঝাব তা নিয়ে আমাকে একটু ভাবতে দাও। বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে জেনে পরে বাচ্চাকে বুঝিয়ে দিন। ‘না’ দিয়ে বলবেন না : নর নারীর সম্পর্ক বা জন্মরহস্য নিয়ে বাচ্চাও প্রশ্নের মুখোমুখি হলে আপনার উত্তর হওয়া উচিত আবশ্যিকভাবে সদর্থক। ছোট্ট একটা উদাহরণ দিয়ে বলি-
• মা, আমি কিভাবে হলাম?
• তুমি হয়েছো আমার আর তোমার বাবার ভালোবাসা থেকে। আমরা দুজনে ভালোবেসে তোমাকে চাইলাম, তাইতো তুমি হলে, সোনা!
• মায়ের পেট থেকে বাচ্চা কিভাবে বেরোয়?
• মায়ের পেটের ভেতর একটা থলির মধ্যে বাচ্চা আস্তে আস্তে বড় হয়। অনেকটা বড় হওয়ার পর জন্মের একটা রাস্তা আছে সেই রাস্তা দিয়ে বাচ্চা মায়ের শরীর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। ঠিক যেভাবে স্কুল ছুতি হলে ক্লাসের দরজা দিয়ে তুমি বেড়িয়ে আসো।
বাচ্চার ব্যাপারে যা যা করবেন না : • টিভি বা ভিডিওর মারদাঙ্গা, ধর্ষনের চেষ্টা বা শারীরি ঘনিষ্টতার ছবি বাচ্চাকে দেখতে দেবেন না।আপনি একটু সচেতন হলেই পারবেন। যৌন রসিকতা বা গল্প বাচ্চার সামনে ভুলেও নয়।
• একটু বড় বাচ্চার সামনে বা বাচ্চাকে কাছাকাছি রেখে শারীরি ঘনিষ্টতার দিকে এগোবেন না।
• সম্ভব হলে সাত আট বছরের পর থেকে বাচ্চাকে বাবা মায়ের সঙ্গে এক বিছানায় শোয়াবেন না।
• বাচ্চা যৌনতা বিষয়ক কোন আকস্মিক প্রশ্নয় করলে চেপে যাবেন না। গল্পছলে এবং একটু বুদ্ধি খাঁটিয়ে উত্তর দিন।
• ছেলে বা মেয়েকে কমবয়স থেকে বিকৃতকাম পরিনতবয়স্ক পুরুষ বা মহিলার যৌন নির্যাতনেরা শিকার হয়ে পড়ার বিষয়ে সাবধান হতে/ সাবধান করতে ভুলবেন না। এরকম দূর্ভাগ্যজনক ঘটনার শিকার হয়ে অনেক ছেলে মেয়ে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়। সচেতন হোন, সতর্ক থাকুন।
টিনএজ ছেলেমেয়েদের বাবা মায়েরা শিখুন : বয়ঃসন্ধিকাল সব ছেলেমেয়ের জীবনেই একধরনের শিক্ষা। শরীর মনে ঘটতে থাকা পরিবর্তনগুলির সঙ্গে মানিয়ে উঠতে না পেরে এই সময় ছেলেমেয়েরা নানা মানসিক এবং শারীরিক সমস্যার মুখোমুখি হয়। ওদের এই বিশেষ সমস্যা্গুলিকে জেনে বুঝে নিন। সমস্যা কাটিয়ে উঠতে ওদের পাশে থাকুন বন্ধুর মত। ওদের মনের দ্বিধা-দ্বন্দ্বগুলিকে এড়িয়ে যাবেন না। সহানুভূতির সঙ্গে ওদের সমস্যাগুলি বুঝুন। বন্ধুর ভূমিকা নিন, ওদের সঙ্গে খোলাখুলি আলচোনা করুন। ছেলেদের সমস্যায় বাবা আর মেয়েদের সমস্যায় মা হতে পারেন সবচেয়ে যোগ্য মানুষটি। • বয়ঃসন্ধির সমস্যা আর মনতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করুন, সুস্থধারার বইপত্র পড়ুন। স্বাভাবিক জীবনবোধের আলোয় ছেলেমেয়ের মধ্যে সুস্থ যৌনচেতনা আপনিই গড়ে তুলতে পারবেন।
• প্রজন্মবাহিত ভুল ধারনা, সংস্কার আর অন্ধকার ভুলেও ছেলেমেয়েদের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে ওদের সর্বনাশ করবেন না। যৌনতা ‘নোংরা, নিষিদ্ধ বা খারাপ কোন ব্যাপার নয়। এ হলো জীবনের এক স্বাভাবিক অঙ্গ। নিজের ভুল আগে শুধরে নিন, তারপর ছেলেমেয়েদের শেখান। ছেলেদের সাথে মেয়েদের বন্ধুর মতো মেশা খারাপ নয়। এরকম সুস্থ সম্পর্ক যৌবনের সমস্যা্ কমায়।
• যৌবনের পরিবর্তনগুলি বিজ্ঞানসম্মত। নিজে জানুন, সন্তানদের বোঝান।
• কথায় কথায় তর্ক করা বা বড়দের অগ্রাহ্য করার প্রবণতা এ বয়সে থাকবেই। উত্তেজিত হবেন না, ছেলেমেয়েদের মারধর করবেন না। শাসনের আতিশয্যে সমস্যাকে জটিল না করে ওদের ভালোটা বুঝিয়ে বলুন। সুস্থ বিতর্কে অংশ নিন।
• এই বয়সে ছেলেমেয়েদের ওপর সতর্ক নজর অবশ্যই রাখবেন। তবে সব ব্য্যাপারে নাক গলাতে যাবেন না। ওদের স্বাধীনতার বোধকে সন্মান করতে শিখুন। এতে দূরত্ব কমবে।
• সবসময় ‘এটা ভালো না, ওটা কোরো না’ বলতে যাবেন না। যুক্তি দিয়ে, ভালোবেসে বুঝিয়ে বলুন যা ওদের জন্য মঙ্গলজনক হবে।
• সন্তানের নিজস্ব জগতে ঢুকতে চাইবেন না। ওদের কল্পনার জগতটা ভেঙ্গে দেবেন না। আত্মজের ভূবন আপনি নিজের মত গড়তে চাইলে ওদের ভবিষ্যত ক্ষতিগ্রস্ত হবেই।

  • ১৫-১৬ বছর বয়সে মা মেয়েকে বুঝিয়ে দিন—
১। যৌনতার বাস্তবতা
২। শরীর মনের সম্পর্ক
৩। ঋতুচক্রের বিজ্ঞান
৪। অতি-যৌনতার বিপদ
৫। ব্যাক্তিগত সতর্কতা

• এই বয়সে বাবা ছেলেকে বুঝিয়ে বলুন-
১। যৌনতার বাস্তবতা
২। অতি-যৌনতার বিপদ
৩। পর্ণোগ্রাফির ফাঁদ, অতিরঞ্জন ও অসারতা
৪। যৌনরোগের বিস্তার ও বিপদ

• ১৭-১৮ বয়সে ওদের বুঝিয়ে বলুন-
১। জন্মরোধের ব্যাবস্থাগুলি সম্পর্কে
২। প্রাক-বিবাহ মেলামেশার বিপদ নিয়ে
৩। অবাধ যৌনতার সর্বনাশ আর মারাত্মক যৌনরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ার বিপদ সম্পর্কে
৪। নেশা ও মাদকাশক্তির ভয়াবহতা সম্পর্কে অবশ্যই সন্তানদের সচেতন করুন।
• ছেলে ও মেয়েকে বৈজ্ঞানিক যৌনশিক্ষা পেতে সাহায্য করুন। এ ব্যাপারে বইপত্র পেতে ছেলেমেয়েদের পাশে দাঁড়ান। স্বঘোষিত বিশেষজ্ঞদের থেকে সাবধান করুন।

Deprecated: mysql_connect(): The mysql extension is deprecated and will be removed in the future: use mysqli or PDO instead in /home/banglade/public_html/condb.inc.php on line 4