ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম ও
ওয়াসা’র অন্তরালের আমলনামা, ১মপর্ব
জাইম ফরাজী জুলফি

একটানা ১১ বছর ধরে ঢাকা ওয়াসার এমডি পদে আসীন থেকে প্রকৌশলী তাকসিম এ খান একটানা ক্ষমতায় থাকার রেকর্ড গড়েছেন ! সম্প্রতি ওয়াসা বোর্ডকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ষষ্ঠ দফায় মেয়াদ বাড়াতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তাকসিম এ খান।
২০০৯ সালের ৩১ মে একটি জাতীয় দৈনিকে এমডি পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিতে পয়ঃনিষ্কাশন কাজে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হলেও নিয়োগের সময় তৎকালীন বোর্ড চেয়ারম্যান প্রকৌশলী গোলাম মোস্তফা গণপুর্তর আতিরিক্ত প্রকৌশলী মো রেজা্উল করিমসহ আরও একজন যোগ্য প্রার্থীকে পাশ কাটিয়ে ৫৩ বছর বয়সী তাকসিম এ খানকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করলে মন্ত্রণালয় তাকে নিয়োগ দেয়।
তৎকালীন বোর্ড চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা মনে করতেন ওয়াসায় এ পর্যন্ত যত এমডি ছিল তার মধ্যে ‘হি (তাকসিম) ইজ দ্যা বেস্ট’।
প্রথম চুক্তির ৩ বছর পূর্ণ হওয়ার পর আবারও ১ বছর বাড়ানো হয় এমডির নিয়োগের মেয়াদ। পরের বার পূর্ণ মন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে বোর্ডের সুপারিশ ছাড়াই তৎকালীন প্রতিমন্ত্রীকে ধরে তড়িঘড়ি করে আরও একবার মেয়াদ বাড়িয়ে নেন তাকসিম, যা ওয়াসা আইনেরও পরিপন্থি।
শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, আইনজীবী, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসহ বিভিন্ন পেশাজীবী নেতা ও ওয়াসার কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত হয় ১৩ সদস্যের ওয়াসা বোর্ড। সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের মতামতের ভিত্তিতে প্রকল্প বোর্ডে পাস হয়। কিন্তু বোর্ডকে পাশ কাটিয়ে বারবারই পুনর্নিয়োগ নিয়েছেন তাকসিম এ খান। 
এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে যেসব শর্ত ও অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়, সে শর্তের কোনোটিই তাকসিম এ খানের নেই। এর পরও রহস্যজনকভাবে ওয়াসা বোর্ড তাকসিম এ খানকেই নিয়োগ দেয় এমডি হিসেবে। 
২০১২ সালের ১৩ অক্টোবর ওয়াসার এমডি হিসেবে প্রথম দফায় তিন বছরের নিয়োগের মেয়াদ শেষ হলে ওয়াসা আইনকে পাশ কাটিয়েই ওয়াসা বোর্ড তিন বছরের পরিবর্তে এক বছরের জন্য তাকসিম এ খানকে ২য়বারের মতো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়। ২০১৩ সালের ১৩ অক্টোবর এ চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। আবারও ওয়াসার আইন ও নিয়ম ভেঙে কোনো ধরনের বিজ্ঞপ্তি এবং পরীক্ষা ছাড়াই তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। 
২০১৭ সালের অক্টোবরে পঞ্চমবারের মতো নিয়োগ পেতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করেন তাকসিম এ খান। আবারও ওয়াসা বোর্ডকে পাশ কাটিয়ে মন্ত্রণালয়ে ফাইল পাঠানো হয়। এমডি নিয়োগ বিষয়ে কোনো ধরনের বোর্ডসভা অনুষ্ঠিত না হলেও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে তাকসিমের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর সুপারিশ করে ফাইল পাঠানো হয়। 
মন্ত্রণালয়ের সে ফাইলে উল্লেখ করা হয়, ঢাকা ওয়াসার কার্যক্রমের গতিশীলতা অব্যাহত রাখতে ওয়াসা বোর্ডের ২২৫তম সভার সুপারিশে পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী প্রকৌশলী তাকসিম এ খানকে তার বর্তমান চাকরির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর এক বছরের জন্য নিয়োগের প্রস্তাবের সুপারিশকরে। 
ঢাকা শহরে পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশনের উদ্দেশ্যে ১৯৬৩ সালে যাত্রা হয় ঢাকা ওয়াসার। সে সময়ের একটি অধ্যাদেশ অনুযায়ী চলত সংস্থাটি। পরে ১৯৯৬ সালে ‘ওয়াসা অ্যাক্ট’ নামে নতুন আইন আইন অনুযায়ী সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হচ্ছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক । 
বোর্ড চেয়ারম্যান থাকলেও সভা ডাকা ছাড়া তার একক কোনো ক্ষমতা নেই। একারণে ঢাকা ওয়াসার সব ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন তাকসিম এ খান। 
এদিকে আগামী ১৪ অক্টোবর তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। তাই মেয়াদ বাড়াতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। 
এরই মধ্যে ঢাকা ওয়াসার দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও সুশাসন নিশ্চিতে সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ বিভিন্ন পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ অনুসরণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। 
এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অতীতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেজন্য বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নিয়োগ ও অব্যাহত পুনর্নিয়োগের বিষয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নিরীক্ষা দরকার। ২০০৯ সালে ঢাকা ওয়াসার বর্তমান এমডি তাকসিম এ খান নিয়োগ পান। এরপর টানা পাঁচ মেয়াদে ১১ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সর্বশেষ বর্ধিত মেয়াদ ২০২০ সালের ১৪ অক্টোবর শেষ হবে। এর আগেই সঠিক নিয়মে ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এ খাতে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ করতে হবে। একইসঙ্গে ওয়াসার এবং ওয়াসার সেবাগ্রহীতাদের কল্যাণে বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগ ও অব্যাহত পুনর্নিয়োগ বিষয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি ওয়াসার সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদের সুষ্ঠু তদন্ত করে অনিয়ম ও দুর্নীতির জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, প্রতিবারই তার নিয়োগ নবায়নের ক্ষেত্রে কোন না কোনভাবে আইন ও নিয়মের ব্যত্যয় হয়েছে। এমনকি প্রথমবার নিয়োগের সময়ই অনিয়মের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে পরবর্তী নিয়োগে সতর্কতা অবলম্বনের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। তারপরও নানাভাবে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পুনর্নিয়োগ নিশ্চিত করা হয়েছে। বয়সসীমা বাড়িয়ে, বোর্ড সভার সুপারিশ পাশ কাটিয়ে পুরনো সভার তামাদি সুপারিশ ব্যবহার করে, এমনকি বোর্ডের মতামত অগ্রাহ্য করে তার পুনর্নিয়োগ নিশ্চিত করা হয়। 
যা শুধু আইনেরই সুস্পষ্ট ব্যত্যয় নয়, বরং ক্ষমতার অপব্যবহার ও যোগসাজশের অভূত মন্দ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে।
জনমনে প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে যে, কে এই প্রকৌশলী তাকসিম এ খান ? কী তার ক্ষমতার উৎস !(চলবে)
 

অন্তরালের খবর এর আরো খবর