দৃষ্টিপাত: পোর্টস পাড়ার ক্যাসিনো কেলেংকারী
দৃষ্টির অন্তরালে ক্যাসিনো-কাণ্ডের হোথারা।শেষপর্ব
শ্যাম ঠাকুর

ঢাকার নামকরা জুয়াড়ি শফিকুল আলম সেন্টু ২০১৬ সালে কলাবাগান ক্লাবে ক্যাসিনো খোলেন নেপালি নাগরিক দীনেশ, রাজকুমার ও অজয় পাকরালের সঙ্গে। এখান থেকে প্রতিদিন ২ লাখ টাকা করে চাঁদা নিতেন প্রভাবশালী যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাট এমন আভিযোগ আছে । এখান থেকেও চাঁদা তুলতেন আরমান। অভিযোগ আছে, চাঁদার অঙ্কে বনিবনা না হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে ওই ক্লাব বন্ধ করে দেন যুবলীগ দক্ষিণের এক প্রভাবশালী নেতা। অনেক দেনদরবার করেও যা আর চালু করতে পারেননি সেন্টু। তবে ক্লাবের সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজ ওরফে কালা ফিরোজের নির্দেশনায় চালু হয় হাউজি ও জুয়া।
দীনেশ ও রাজকুমারের অংশীদারিত্বে উত্তরায় এপিবিএন অফিসের উল্টো পাশে একটি ভবন ভাড়া করে চালু করা হয় আরেকটি ক্যাসিনো। তাদের পার্টনার হন তছলিম নামের এক স্থানীয় যুবলীগ নেতা। এরপর ওই এলাকায় প্রভাবশারী যুবনেতার তত্ত্বাবধানে স্থানীয় যুবলীগ নেতাদের মাধ্যমে আরও কয়েকটি ক্যাসিনো গড়ে তোলেন তারা, যার প্রতিটি থেকে দিনে ২ থেকে ৪ লাখ টাকা চাঁদা তুলতেন আরমান।
মালিবাগ-মৌচাক প্রধান সড়কের পাশের একটি ভবনে সৈনিক ক্লাব। অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের নামে এই ক্লাব চলে। আর এটি নির্ধারিত টাকায় ভাড়া নিয়ে ক্যাসিনো খোলেন যুবলীগ নেতা জসিম উদ্দিন ও এ টি এম গোলাম কিবরিয়া। তাদের অংশীদার নেপালি নাগরিক প্রদীপ। এই ক্লাব থেকে প্রতিদিন ৪ লাখ টাকা চাঁদা পান ওই যুবনেতা।
বনানীর আহমেদ টাওয়ারের ২২ তলায় ঢাকা গোল্ডেন ক্লাব খোলেন চাঁদপুরের ব্যবসায়ী আওয়াল পাটোয়ারী ও আবুল কাশেম। ক্লাবটি চালুর কিছুদিনের মধ্যেই কৗশলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর বেড়ে যায় এক যুবনেতার মাসোহারার অঙ্ক। ওই সময় যুবলীগ নেতা আরমান জোর করে ক্লাবটির মালিকানায় ঢুকে পড়েন। নেপালি নাগরিক অজয় পাকরালের তত্ত্বাবধানে চলত ক্যাসিনোটি। এখান থেকেও ওই যুবনেতার জন্য প্রতিদিন ৪ লাখ টাকা চাঁদা তুলতেন আরমান।
মহিউদ্দীন মহির ইশারা ছাড়া ঐহিত্যবাহী ক্রীড়া সংগঠন ব্রাদার্স ইউনিয়নের পাতাও নড়ে না বলে স্থানীয়দের মধ্যে জনশ্রুতি রয়েছে। সন্ধ্যার পরই এই ক্লাবে চলে জুয়া আর হাউজি।
দিলকুশা ক্লাবের মালিক নেপালি নাগরিক দীনেশ, রাজকুমার ও ছোট রাজকুমার। ভারতীয় আরও দুজন অংশীদার থাকলেও তাদের নাম জানা যায়নি। এই ক্যাসিনো থেকে এক যুবনেতার চাঁদা প্রতিদিন ৪ লাখ টাকা। আরমানের নিজের চাঁদা ১ লাখ। ক্লাবটি চালু করতে ওই যুবনেতাকে অগ্রিম দিতে হয় ৪০ লাখ টাকা। আর আরমান অগ্রিম নেন ১০ লাখ। 
স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও যুবলীগ দক্ষিণের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মমিনুল হক সাঈদের তত্ত্বাবধানে একসময়ের ফুটপাত হকার মতিঝিল থানা যুবলীগের বর্তমান নেতা জামালের মালিকানায় ক্যাসিনো খোলা হয় আরামবাগ ক্লাবে। মমিনুল হক সাঈদ তার অলিখিত অংশীদার। আছে নেপালি অংশীদারও। এই ক্যাসিনো থেকে প্রতিদিন তিন লাখ টাকা দেওয়া হয় দক্ষিণ যুবলীগের এক প্রভাবশালী নেতাকে।
তেজগাঁও লিঙ্ক রোডের ফুওয়াং ক্লাবে একসময় মদ বিক্রির পাশাপাশি নিয়মিত বসত ডিজে গানের আসর। কক্ষে কক্ষে চলত নাচ-গান। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের চলমান দ্বিতীয় মেয়াদে ক্লাব মালিক নূরুল ইসলামের সঙ্গে তেজগাঁও জোনের এক পুলিশ কর্মকর্তার ঝামেলার কারণে অভিযান চালিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয় ডিজে আয়োজন। নেপালি সুন্দরী তরুণী ও তরুণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমে জাঁকজমকভাবে খোলা হয় ক্যাসিনোটি। ক্লাবটির একক মালিক নূরুল ইসলাম পুরস্কারঘোষিত এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর আত্মীয় হওয়ায় এই ক্লাবে যুবলীগ নেতার চাঁদার পরিমাণ কম। দিনে ২ লাখ টাকা।
একসময় বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত থাকার কারণে ১৯৯৪ সাল থেকে মোহামেডান ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হন লোকমান হোসেন। বনে যান ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক। ২০১১ সালে ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটি লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হওয়ার পর সভাপতি পদ থেকে মোসাদ্দেক হোসেন ফালু সরে গেলেও থেকে যান লোকমান। ভোটবিহীন অবস্থায় দুই বছরের জন্য তিনি সদস্যসচিব নির্বাচিত হলেও এখনো তিনি স্বপদে বহাল রয়েছেন। খেলোয়াড়দের কল্যাণ এবং ক্লাবের মানোন্নয়নের কথা বলে তিনি ক্যাসিনো বসান একক সিদ্ধান্তে। যদিও এখান থেকে অর্জিত কোনো টাকা তিনি ক্লাবের মানোন্নয়নে ব্যয় করেন না। 
বনানীর ঢাকা গোল্ডেন ক্লাবের মালিক ব্যবসায়ী আবুল কাশেম ও মতিঝিলের স্থানীয় যুবলীগ লীগ নেতা ইমরানের মালিকানায় মোহামেডান ক্লাবে চলছিল ক্যাসিনো। এর নেপালি অংশীদার কৃষ্ণা। রাজধানীর সবচেয়ে অত্যাধুনিক ক্যাসিনোটিতে এরই মধ্যে অভিযান চালানো হয়েছে। এখান থেকে প্রতিদিন আরমানের মাধ্যমে ৫ লাখ টাকা চাঁদা পেতেন দক্ষিণ যুবলীগের ওই নেতা।
বিএনপির সময় ইব্রাহীমপুরের আবুল হোসেন লিটন ও তার স্ত্রী সুফিয়া মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবে জুয়া ও হাউজি চালালেও ২০০৯ সালে তা নিজের দখলে নিয়ে নেন দক্ষিণ যুবলীগের এক প্রভাবশালী নেতা। তার চাচা হিসেবে পরিচিত পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী আলী হোসেনকে সামনে রেখে এই ক্লাবে ক্যাসিনো চালু করেন। নেপালের দীনেশ ও রাজকুমার তার ব্যবসায়িক অংশীদার। আলী হোসেনের নামে ক্যাসিনোটি চললেও এর মূল মালিক ওই যুবলীগ নেতা। কিন্তু কাগজে-কলমে তার নাম নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
চারদিকে জুয়ার টাকা উড়তে দেখে লোভে পড়েন যুবলীগের আরেক নেতা খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া। স্থানীয় সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেননকে চেয়ারম্যান করে প্রতিষ্ঠা করেন ইয়ংমেন্স ক্লাব। ফুটবল, ক্রিকেটের উন্নয়নের কথা বলে ক্লাবটি প্রতিষ্ঠার পর অত্যাধুনিক সরঞ্জাম এনে নিজেই চালু করেন ক্যাসিনো। কমলাপুর আইসিডির কিছু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে চীন থেকে আমদানি করা অত্যাধুনিক সরঞ্জাম এনে বসান তার ক্যাসিনোতে। এখান থেকেও ৪ লাখ টাকা চাঁদা নিতেন যুবলীগ দক্ষিণের প্রভাবশালী সেই নেতা।
এলিফ্যান্ট রোডের অ্যাজাক্স ক্লাব চালু হয় যুবলীগ নেতা আরমান, তছলিম ও খোরশেদের তত্ত্বাবধানে। নেপালি নাগরিক ছোট রাজকুমারকে দিয়ে ক্যাসিনোটি চালু করেন তারা। এই ক্যাসিনো থেকে প্রতিদিন দক্ষিণের যুবলীগের পরাক্রমশালী নেতার পকেটে যেত ৩ লাখ টাকা।
ইস্কাটন সবুজ সংঘ, একসময়ের ঐতিহ্যবাহী এই ক্লাবে খেলার বদলে চলে জুয়া আর হাউজি। সন্ধ্যা ৬টা থেকে ভোর পর্যন্ত সপ্তাহের সাত দিনই চলে জুয়ার ব্যবসা। মনোরঞ্জনের জন্য ব্যবস্থা রাখা হয় নানা ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্যের। একসময় শীর্ষ সন্ত্রাসী তকমা পাওয়া এক ব্যক্তি ক্লাবটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেন মাদারীপুরের সারোয়ার ও জামালের মাধ্যমে। তবে একজন সংসদ সদস্য ও যুবলীগের এক নেতাকে মোটা অঙ্কের মাসোহারা দিয়ে আসছেন তিনি।
জানা গেছে, গুলশান এলাকায় একাধিক বার ও ক্লাবের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন কালা নাসিরের বন্ধু তালাল রিজভী নামের একজন। জাতীয় পার্টির একজন প্রভাবশালী নেতার প্রত্যক্ষ মদদে তালাল রিজভীর ইশারায় ওই ক্লাবগুলোতে কয়েক দিন আগ পর্যন্ত চলত নানা ধরনের অপকর্ম। অন্যদিকে ২০ নম্বর ওয়ার্ডের যুবলীগ নেতা কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দীন রতন তার এলাকার বিভিন্ন পেশাজীবী ও স্পোর্টস ক্লাবে হাউজি ও জুয়ার মদদদাতা।
 
কলুষমুক্ত বিশুদ্ধ আওয়ামী লীগ দেখতে চাওয়া দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরা। দুর্নীতি, অপকর্ম আর দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের সঙ্গে জড়িতরা দলে আর যেনো মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে তেমনটিই প্রত্যাশা তাদের। সেই অভিযানে খুশি  ছিলেন দলের তৃণমুলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা। ‘শুদ্ধি অভিযানে’ আতঙ্কিত ছিলেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। কখন কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয় কিংবা ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে দলের আগামী সম্মেলনে কমিটি থেকে বাদ পড়েন অথবা কমিটিতে পদ না পান এসব বিষয় নিয়ে চিন্তা ছিলো। তখন এ বিষয়ে গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিগত মন্ত্রিসভার চারজন মন্ত্রী, ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোটের তিনজন শীর্ষ নেতা, একটি সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র, ঢাকার চারজন এমপি রয়েছেন। এর মধ্যে একজন একটি অভিজাত এলাকার এমপি ক্যাসিনো কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে রিপোর্ট রয়েছে। এছাড়া দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ নানা অপকর্মের কারণে বর্তমান ২৫ জন এমপি ও সাবেক ১২ জন এমপি প্রধানমন্ত্রীর কালো তালিকায় রয়েছেন। কিন্তু পরবর্তীতে কারো বিরুদ্ধে গত এক বছরেও আর কোন ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি বলে এই সব অভিযানকে শ্রেফ আইওয়াশ বলতে চান বিদগ্ধ মহল।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমু বলেছিলেন, দুর্নীতি মুক্ত সমাজ গড়ার জন্য শেখ হাসিনা মদ ও জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছেন। উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেছিলেন, আজকে কিছু অনুপ্রবেশকারী দলে প্রবেশ করে আমাদের সুনাম নষ্ট করার চেষ্টা করছে। 
ঘটনার পর প্রায় এক বছর হতে চলল সব অভিযান থিতিতে পড়ায় সরকারের অন্তরিকতা নিয়ে যদি জনমনে প্রশ্ন ওঠে,তবে কি তাদের দোষ দেওয়া যায় ?
(শেষ)
 

অন্তরালের খবর এর আরো খবর