ব্যবস্থাপনার সংকটেই কিট সংকট!
জুলফিকার মুর্তজা বাদল

করোনা পরীক্ষা যখন কিট সংকটে প্রকট তখন মজুদের তথ্য নিয়ে শুরু হয়েছে লুকোচুরির খেলা। দেশের তিন থেকে চারটি ব্যবসায়ী গ্রুপ প্রায় ১০ লাখের মতো কিট এনে রেখেছে বলে জানা যায় কিন্তু তারা মিঠু সিন্ডিকেটের কারণে তা দিতে পারছে না এমন অভিযোগ সর্বত্র। স্বাস্থ্য খাতে মিঠু সিন্ডিকেট যত দিনে ভেঙে ফেলা না যাবে তত দিন এই খাতে ভালো কিছু হবে না বলে অভিজ্ঞমহলের ধারণা।
বিভিন্ন জেলায় কিটের অভাবে নমুনা পরীক্ষা বন্ধ অথবা সীমিত করা হয়েছে। নমুনা পরীক্ষা বন্ধ থাকার কারণে মানুষের মধ্যে হাহাকার সৃষ্টি হয়েছে। 
আক্রান্ত ও মৃতের উচ্চ সংক্রমণের এই সময়ে বিশেষজ্ঞরা যেখানে বেশি বেশি নমুনা পরীক্ষার ওপর জোর দিচ্ছেন; ঠিক তখনই হঠাৎ করে কিটের সংকট দেখা দিয়েছে।তবে কিটের মজুদ নিয়ে নতুন করে আর কোনো তথ্যই দিচ্ছে না স্বাস্থ্য বিভাগ।
উচ্চ সংক্রমণের এই সময়ে বিশেষজ্ঞরা প্রতিদিন অন্তত ৩০ হাজার নমুনা পরীক্ষার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছেন। সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা তো দূরের কথা, বর্তমানে যে পরিমাণ পরীক্ষা হচ্ছে কিট সংকটের কারণে তাও হুমকির মুখে ।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকও কিট সংকটের কথা স্বীকার করেছেন। এর আগের দিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ কিট সংকটের কথা জানিয়ে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছিলেন। 
কিটের বাণিজ্য মূলত চারটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওই গ্রুপটি কিট নিয়ে বেপরোয়া বাণিজ্য করায় নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি মূল্যে তারা কিট সরবরাহ করে চলেছে।
কিটের সার্বিক বিষয় দেখভাল করছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা। 
বেশি সংকট হলুদ কিটের।আরটিপিসিআরের দুই ধরনের মেশিন রয়েছে। এক ধরনের মেশিনে লাল এবং অন্যটিতে হলুদ কিট ব্যবহার করা হয়। হলুদ কিটের আমদানি বন্ধ কারণ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে কিট সরবরাহকারীরা হলুদ কিট না এনে সব লাল কিট এনেছেন। ফলে হলুদ কিট ব্যবহারকারী আরটিপিসিআর মেশিনগুলোতে পরীক্ষা বন্ধ হয়ে গেছে। এ কারণেই অনেক স্থানে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানা যায়।
নমুনা পরীক্ষার জন্য সর্বশেষ কেনা ২১টি আরটিপিসিআর মেশিন ২০০৯ সালের মডেলের। তাই ওই সব মেশিনের কিট পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। চাহিদা থাকার পরও এসব মেশিনের কিট সরবরাহ করা  সম্ভব হচ্ছে না। 
করোনা সংক্রমণের শুরুতে একমাত্র আইইডিসিআর ল্যাবরেটরিতে নমুনা পরীক্ষা করা হতো। এখন এই ল্যাবের সংখ্যা বেড়ে ৬৬টিতে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ৩২টি ল্যাবরেটরি ঢাকায় এবং ৩৪টি ঢাকার বাইরে বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা হয়েছে। 
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক ঢাকাসহ সারাদেশে ৫৪টি বুথ স্থাপন করে নমুনা সংগ্রহের কাজ করছে।কিটের স্বল্পতা কারণে প্রতিটি বুথে প্রতিদিন ৩০টির পরিবর্তে ১৫টি করে নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এদিকে অর্থের অভাবেই আটকে আছে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ টেস্টের কিট আমদানি বলে তথ্য পাওয়া গেছে।ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ, কিট সরবরাহ করলেও এখনো একটি টাকাও পরিশোধ করেনি কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএইচডি)। তাই তাদের আমদানি বন্ধ আছে । বিকল্প হিসেবে ছোট ছোট লটে কিট আমদানি করছে সিএমএইচডি। গত তিন মাসে কিট এসেছে সাত লাখের বেশি। 
কিটের সরবারহ নেই তাই বন্ধ করোনা টেস্টের বুথ। কোথাও আবার নির্দিষ্ট সংখ্যার বাইরে চাইলেও টেস্ট করা সম্ভব হচ্ছে না। দেশজুড়ে রোগী বাড়লেও সেই তালে বাড়ছে না টেস্টের সংখ্যা। 
কয়েক দফা একাধিক প্রতিষ্ঠান কিট সরবারহ করলেও এখনো তাদের একটি টাকা বিলও পরিশোধ করেনি সিএমএইচডি। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, টাকা না পেয়ে তারা নতুন করে আর এলসি খুলছেন না, তাই তারা বন্ধ রেখেছেন কিট আমদানি।
এখন এমন একটা অবস্থা কোম্পানি বন্ধ করে দিয়ে ওদিক সাপ্লাই দিতে হবে। কেন্দ্রীয় ঔষধাগারতো কাউকে কোন বিলই দিচ্ছে না। বলে যে প্রসেসিং-এ আছে, এই কথাতে মাস শেষ হয়ে যাচ্ছে। মন্ত্রিপরিষদের দোহাই দেয়া হয়। 
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মতে, করোনা মোকাবিলায় ৯০০ কোটি টাকা বাজেট থাকলেও হাতে পেয়েছে মাত্র আড়াই'শ কোটি টাকা। বাজেটের অন্তবর্তীকালীন সময় হওয়ায় বাকি বরাদ্দ পেতে কিছু জটিলতা রয়েছে  বলে তারা জানায়। 
বহুমূখী সংকট অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঢিমেতালের চলনের ফলে দেশের করোনার আক্রান্তের হার দ্রূত গতিতে বেড়েই চলেছে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যখন বলছে, পরীক্ষা, পরীক্ষা ও পরীক্ষা, তখন টেস্টকিটের আভাবে দেশের অপ্রতুল পরীক্ষা ব্যবস্থাও মূখ থুবরে পড়লে করোনার বিরুদ্ধে আরও পিছিয়ে পড়বে বাংলাদেশ, বাড়বে আক্রান্ত্রের সংখ্যা ও লাশের সারি।(শেষ)
 

অন্তরালের খবর এর আরো খবর