কিট সংকটের অন্তরালে লুটেরা সিণ্ডিকেটের কীট ! (এক)
জুলফিকার মুর্তজা বাদল

প্রাণঘাতী করোনা মহামারীতে দেশের স্বাস্থ্যখাতের বেহাল দশার শুরু থেকেই নানা ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়ে আসছে স্বাস্থ্য বিভাগ। নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষানীতির কারণে অনেকের রোগ নির্ণয়ই করা সম্ভব হয়নি। এরপর  ল্যাবের সংখ্যা বাড়ানো হলেও দেখা দিয়েছে কিট সংকটে অনেক জায়গায় বন্ধ হয়েছে করোনা টেষ্ট । অবাক করার মতো খবর এই যে,
ফেনীতে কীট না থাকায় ৭ দিন ধরে বন্ধ ছিল করোনা পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ। গত ১৯ জুন থেকে জেলায় নতুন করে করোনা পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ বন্ধ ছিল। ফেনীর সংগ্রহীত নমুনা নোয়াখালীর আবদুল মালেক উকিল মেডিকেল কলেজের পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হলেও কিট সংকটের কারনে তা বন্ধ ছিল। এতে করে পূর্বের সংগৃহীত ১২৭৩ জনের নমুনাও আটকে ছিল পরীক্ষাগারে। 
গত ২০ জুন পর্যন্ত ফেনীতে ৬৫৩ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ১৪ জন। সুস্থ্য হয়েছে ১৩৫ জন। জেলায় এ পর্যন্ত ৪৫৫০ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে প্রেরণ করা হয়। এর মধ্যে ৩২৭১ জনের ফলাফল পেয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। 
জেলায় বর্তমান করোনা সংক্রমণ সর্বোচ্চ সীমার মধ্যে রয়েছে। প্রতিদিনই বাড়ছে নমুনা সংগ্রহের আবেদন। গত ১৯ জুন থেকে কীট সংকটের কারণে ফেনীতে নমুনা সংগ্রহ বন্ধ থাকায় সংক্রমণের ঝুঁকি আরো বেড়েছে।
পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও নার্স না থাকায় হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা পাওয়া যাচ্ছে না বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
এছাড়াও অনেকে নমুনা দিয়ে ফল পেতে ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত অপেক্ষাধীন আছেন অনেকেই।
চিকিৎসা সেবা না পাওয়ার বিষয়ে জানা যায়, জেনারেল হাসপাতালে ডাক্তার ও নার্সের সংকট রয়েছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরও তীব্র সংকট রয়েছে। হাসপাতালে ৫৫ জন ডাক্তারের পদ থাকলেও কর্মরত রয়েছে ৫০ জন। এদের মধ্যে সরকারি নির্দেশনা মতে শারীরিক জটিলতার কারণে করোনা রোগী চিকিৎসা থেকে বিরত রয়েছেন ৮জন চিকিৎসক। অপরদিকে হাসপতালে ১৪৬টি নার্স’র পদ থাকলেও নতুন পুরোনো মিলিয়ে কর্মরত রয়েছে ৮২জন। সারাদেশে নতুন ৫ হাজার নিয়োগকৃত নার্সের মধ্যে ফেনীতে ৬৫ জন পদায়নের কথা থাকলেও নতুন নার্স এসেছে মাত্র ৫ জন। এছাড়াও আরও ৩১ জন নার্স জেনারেল হাসপাতালে বদলী করা হলেও যোগ দিয়েছে ১৫জন। এদের সবাই ৮২ জনের অন্তর্ভূক্ত। 
ল্যাব এবং টেস্টিং কিটের অভাবে করোনা ভাইরাস  পরীক্ষা নিয়ে সংকট চরমে।
নমুনা সংগ্রহ এবং পরীক্ষার সাথে জড়িতদের অনেকে জানিয়েছেন, এখন নমুনা সংগ্রহ কমিয়ে দেয়া হয়েছে এবং একেবারে প্রয়োজন ছাড়া পরীক্ষা করা হচ্ছে না।
প্রতিদিন সংক্রমণের উচ্চহারের মুখে ৩০ হাজার নমুনা পরীক্ষার টার্গেটের কথা বলা হলেও এখন ১৬ বা ১৭ হাজারের মধ্যে তা সীমাবদ্ধ থাকছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেছে, কিট নয়, ল্যবরেটরির অভাবে পরীক্ষার ক্ষেত্রে জট লেগে যাচ্ছে।
যদিও সংক্রমণ শুরুর তিন মাস পর একটি ল্যাব থেকে ল্যাবের সংখ্যা ৬২তে নেয়া সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে ৩২টি ল্যাবরেটরিই ঢাকায় এবং বাকিগুলো বিভিন্ন বড় শহরে। এগুলোর মাঝেও ল্যাব সংক্রমিত হয় এবং সেজন্য সব ল্যাব একসাথে চালু রাখা যায় না। ফলে প্রতিটি ল্যাবেই নমুনার জট লেগেই আছে বলে বলছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
এর মাঝে পরীক্ষার কিটের অভাব দেখা দেয়ায় পরীক্ষায় সংকট আরও বেড়েছে।
সরকারের সাথে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ৫৪টি বুথ বসালেও কিটের সংকটের কারণে এখন নমুনা সংগ্রহ কমানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকেই বেঁধে দেয়া হয় একটা সংখ্যা।এখন বলা হয়েছে,  কম নমুনা সংগ্রহ করতে কারণ কিটের স্বল্পতা আছে।
ছবির কপিরাইটএঊঞঞণ এবং কিট সংকটের কারণে নমুনা সংগ্রহ কমিয়ে দেয়া হয়েছে বলে এই 
দেশের অনেক ল্যাবেই কিটের অভাবে পরীক্ষা কমিয়ে দেয়ার খবর পাওয়া গেছে। নোয়াখালী জেলা শহরের দু'টি ল্যাবে পাশের ফেনী এবং লক্ষ্মীপুর জেলার নমুনাও পরীক্ষা করা হলেও কয়েকদিন ধরে কিটের সংকটের কারণে তাদের একটি ল্যাবে পরীক্ষা বন্ধ রাখতে হয়েছে।
করোনাভাইরাস নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে আগে দেশে মজুদ থাকা কিটের তথ্য তুলে ধরা হতো।রহস্যজনক কারণে অনেক দিন ধরেই কিট সম্পর্কে তথ্য দেয়া বন্ধ রাখা হয়েছে।ল্যাবরেটরীর অভাবকে বড় সমস্যা হিসাবে দেখছে স্বাস্থ্য এদিকে কিটের মজুদ সম্পর্কে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেউ মুখ খুলতে রাজি নন। তাদের বক্তব্য বিভিন্ন দেশ থেকে কিট আনা হচ্ছে এবং তা আসতে শুরু করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম বলেন,"আমার কিটের চেয়ে বড় সমস্যা ল্যাবরেটরি। যে কয়টা ল্যাবরেটরি আছে, তারা সময়মতো টেস্ট করে কুলায় উঠতে পারছে না। এখন ৬২টা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা হচ্ছে। এই ৬২টা ল্যাবরেটরি ১৬ হাজার বা ১৭হাজারের বেশি টেস্ট করতে পারছে না। ফলে কোন কোন ক্ষেত্রে এই টেস্টের রিপোর্ট পেতে ৭দিনও চলে যাচ্ছে। তো একজনের লক্ষণ আছে, তিনি ৭দিন অপেক্ষা করবেন, কোন চিকিৎসা নেবেন না, এটাতো হবে না।"
এদিকে কিট সংকটের পিছনে সিন্ডিকেটের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।  বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন বেশি বেশি ল্যাব স্থাপন করে বেশি মানুষকে পরীক্ষার আওতায় আনতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও একই পরামর্শ দিয়ে আসছে। এ অবস্থায় কিট সংকট করোনা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুরেছে।
শুরু থেকেই দেশে পর্যাপ্ত কিট থাকার কথা জানালেও কিছুদিন ধরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনে কিট মজুতের তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না। এ নিয়ে অধিদপ্তর থেকে কোনো ব্যাখ্যাও না পাৗয়া গেলেও সরকার দলীয় সংসদ সদস্য ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সদস্য একরামুজ্জামান চৌধুরী ভয়াবহ তথ্য প্রকাশ করেছেন।
একরামুজ্জামান চৌধুরী জানান, কিট সংকটের পেছনে একটি সিন্ডিকেট দায়ী। কিছু ব্যবসায়ীর হাতে কিট থাকলেও এ সিন্ডিকেট তা বাজারে আনতে দিচ্ছে না। এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এ জন্য ঠিকাদার মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুকে দায়ি করেছেন তিনি।
কিটের অভাবে বিভিন্ন জায়গায় ল্যাব তিন-চারদিন বন্ধ থাকারও খবর আসছে। টেস্টিং কিটের ঘাটতি দেখা দেয়ায় করোনাভাইরাস পরীক্ষা হচ্ছে ধীরগতিতে। নমুনা সংগ্রহ এবং পরীক্ষার সঙ্গে জড়িতদের অনেকে জানিয়েছেন, এখন নমুনা সংগ্রহ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। 
কয়েকদিন ধরেই দেখা যাচ্ছে, নমুনা পরীক্ষার পরিমাণ উল্টো কমছে। এর মধ্যে দেশের একাধিক করোনা ল্যাব জানিয়েছে, কিট না থাকায় পরীক্ষা করতে পারছে না তারা। ৬৬টি টেস্টিং সেন্টারের সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে চাহিদা আছে ২০ হাজার কিটের। 
প্রতিদিন প্রায় লক্ষাধিক মানুষ করোনা টেস্ট করাতে চাইলেও পারছেন না। বুথের সামনে দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টার অপেক্ষা করেও আনেকে ফিরে যাচ্ছেন।
 
স্বাস্থ্য খাতের ভয়াবহ দুর্নীতি ও জালিয়াতির নেপথ্যে অত্যন্ত প্রভাবশালী  সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে আছে পুরো স্বাস্থ্য খাত। আর এই সিন্ডিকেটের নেপথ্য নায়ক এই খাতের মাফিয়া ডন হিসেবে পরিচিত মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুসহ অন্যসেব ঠিকাদাররা। তাদের সহযোগীতা করে থাকেন স্বাস্থ অধিদপ্তরের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারী বলে অভিযোগ আছে।
নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ একরামুল করিম চৌধুরী বলেন, আমার জানা মতে, বাংলাদেশের তিন-চারটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান প্রায় ১০ লাখ কিট এনে রেখেছে। কিন্তু তারা তা দিতে পারছে না মিঠু সিন্ডিকেটের কারণে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ‘মিঠু সিন্ডিকেট’ যতক্ষণ পর্যন্ত ভাঙা না যাবে, ততক্ষণ এই মন্ত্রণালয় কখনো ভালো থাকবে না। সিন্ডিকেটের কারণে দেশে করোনা পরীক্ষার কিট সংকট সৃষ্টি হয়েছে।  (চলবে)
 

অন্তরালের খবর এর আরো খবর