রোহিঙ্গাদের ফেরা নিয়ে আরো অনিশ্চয়তা
খবরের অন্তরালে প্রতিবেদক :

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াবিষয়ক সমঝোতার পর তাদের ফিরে যাওয়া নিয়ে আরো অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার হওয়া সমঝোতায় দুই মাসের মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার কথা থাকলেও কবে নাগাদ শেষ হবে তা উল্লেখ নেই। গতকাল শুক্রবার জাতিসংঘ বলেছে, ফেরত যাওয়ার প্রক্রিয়া অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে হতে হবে। প্রত্যাবাসন হতে হবে নিরাপদ ও সম্মানজনক। আর বর্তমান পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার মতো পরিবেশ নেই। সেখান থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে রোহিঙ্গারা এখনো বাংলাদেশে আসছে। এদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণকাজে জাতিসংঘের সংস্থাগুলোকে সম্পৃক্ত করার জোর দাবি জানিয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র আড্রিয়ান এডওয়ার্ডস গতকাল শুক্রবার জেনেভায় জাতিসংঘ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরার বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের একটি সমঝোতায় পৌঁছার খবরকে ইউএনএইচসিআর আমলে নিয়েছে। কয়েক দশক ধরে চরম বৈষম্য ও নাগরিকত্বের বঞ্চনার মধ্যে  সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৫ আগস্ট থেকে প্রায় ছয় লাখ ২২ হাজার লোক মিয়ানমারের উত্তর রাখাইন রাজ্য ছেড়ে পালায়। তিনি বলেন, ‘ইউএনএইচসিআর এখনো সমঝোতার বিস্তারিত দেখেনি। শরণার্থীদের (রোহিঙ্গাদের) ফেরার অধিকার আছে। তাদের সেই অধিকারচর্চায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের আলোকে কোনো কাঠামো হলে তাকে স্বাগত জানানো হবে। এর অর্থ হলো, প্রথমে ও সর্বাগ্রে নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের ফিরে যাওয়ার বিষয়টি অবশ্যই স্বেচ্ছায় হতে হবে, আর স্থায়ী সমাধানের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিস্থিতিতে হতে হবে। ’ ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র আরো বলেন, ‘বর্তমানে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের যে পরিস্থিতি তাতে তাদের (রোহিঙ্গাদের) নিরাপদ ও স্থায়ীভাবে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। শরণার্থীরা (রোহিঙ্গারা) এখনো পালাচ্ছে। অনেকে সহিংসতা, ধর্ষণ ও বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতির শিকার হয়েছে। অনেকে পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের মৃত্যু দেখেছে। ’ ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র বলেন, ‘তাদের (রোহিঙ্গাদের) বেশির ভাগেরই ফিরে পাওয়ার মতো খুব সামান্যই অবশিষ্ট আছে। তাদের বাড়িঘর ও গ্রামগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে জোরালো বিভাজন দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আর উত্তর রাখাইন রাজ্যে মানবিক সহায়তাকর্মীদের প্রবেশাধিকারের দাবি এখনো উপেক্ষিত। ’ ইউএনএইচসিআর মনে করে, টেকসই সমাধানের মৌলিক বিষয়গুলো বা রোহিঙ্গাদের সম্মতি ছাড়া পরিস্থিতি পর্যালোচনার আগেই তড়িঘড়ি করে হঠাৎ প্রত্যাবাসন ঠিক হবে না। নিজেদের বাড়িঘরে ফিরে যাওয়ার সুযোগ এবং সেখানে নির্দিষ্ট এলাকায় বন্দি না থাকার বিষয়টি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র বলেন, রাখাইন পরামর্শক কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী নাগরিকত্ব না থাকাসহ এ সংকটের মূল কারণগুলো সমাধান করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউএনএইচসিআর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা দলিল সম্পর্কে বিস্তারিত জানার অপেক্ষায় আছে। আন্তর্জাতিক শরণার্থী ও মানবাধিকারবিষয়ক মানদণ্ড অনুসরণ করে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয় দেশের সরকারকে সহযোগিতা করতে ইউএনএইচসিআর প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে আসা রোহিঙ্গাদের ‘শরণার্থী’ হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মনে করে, শরণার্থী হওয়ার সব শর্তই এ দেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা পূরণ করেছে। তাই তারা তাদের বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের ‘শরণার্থী’ হিসেবে উল্লেখ করে। বাংলাদেশ ১৯৫৭ সালের শরণার্থীবিষয়ক কনভেনশন এবং এর ১৯৬৭ সালের প্রটোকল সমর্থন করেনি। তবে এ দেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রতি বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ মানবিক আচরণ করছে। তাদের জোর করে ফেরত পাঠানোর কোনো পরিকল্পনাও বাংলাদেশের নেই। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে সম্পৃক্ত করার দাবি : নিউ ইয়র্কভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচের শরণার্থী অধিকার বিষয়ক পরিচালক বিল ফ্রেলিক বলেন, আগুনের ধোঁয়া উড়তে থাকা গ্রামগুলোতে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের দুই হাত বাড়িয়ে স্বাগত জানাবে—এমন ভাবনা হাস্যকর। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্পষ্টভাবে বলা উচিত যে ধ্বংস করা বাড়িঘর ও গ্রাম পুনর্নির্মাণ, জমি ফেরত দেওয়া, ফিরে যাওয়া ব্যক্তিদের শিবিরে রাখার ভাবনা বাদ দেওয়া এবং সর্বোপরি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি পর্যবেক্ষণের সুযোগ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের না থাকলে একজনকেও ফেরত পাঠানো যাবে না। ইউএনএইচসিআরের আরেক মুখপাত্র আন্দ্রেজ মাহেচিক বলেন, স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় ইউএনএইচসিআরকে সম্পৃক্ত করার রীতি রয়েছে। রয়টার্স জানায়, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার পর তাদের সংঘাত থেকে রক্ষার নিশ্চয়তা এবং আইনি স্বীকৃতির মতো বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার—কোনো দেশের সরকারের বিজ্ঞপ্তিতেই তথ্য নেই। মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির দপ্তরের এক মুখপাত্রের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের শরণার্থী ও অভিবাসী অধিকার বিষয়ক দপ্তরের পরিচালক শারমেন মোহাম্মদ বলেন, সমঝোতায় জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পুরোপুরি পাশ কাটানো হয়েছে। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে এখনো রোহিঙ্গাদের আসা অব্যাহত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো নিয়ে আলোচনা সময়োপযোগী নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। স্বাগত জানিয়েছে চীন : রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে চীন। দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র জেন শুয়া গতকাল পেইচিংয়ে সাংবাদিকদের বলেন, প্রত্যাশিত ইতিবাচক অগ্রগতিতে চীন আনন্দিত। রাখাইন পরিস্থিতির আগের চেয়ে উন্নতি হয়েছে বলে তিনি জানান। গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সমঝোতার পর বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সমঝোতার পেছনে আন্তর্জাতিক চাপ বা সমঝোতা কাজ করেছে। মিয়ানমারে সরকারি মহলে যোগাযোগ আছে—এমন কয়েকজন সাংবাদিক বলেছেন, সম্প্রতি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরের পর মিয়ানমারে গেছেন। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছে, তাতে চীন ভূমিকা রেখেছে। তবে অন্য আন্তর্জাতিক চাপও এখানে কাজ করেছে বলে ধরে নেওয়া যায়। ‘রোহিঙ্গায় গোল চীনের, সুযোগ হারিয়ে পেছনের সারিতে দিল্লি’ শিরোনামে গতকাল ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনেও বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সমঝোতার ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকার আভাস রয়েছে। রাখাইন পরিস্থিতি উন্নয়নের তাগিদ ইইউয়ের : ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতি বিষয়ক হাইরিপ্রেজেন্টেটিভ ফেদেরিকা মগেরিনি বাংলাদেশ-মিয়ানমার সমঝোতাকে স্বাগত জানালেও রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও সম্মানজনক উপায়ে নিজ ভূখণ্ডে ফেরার সুযোগ সৃষ্টি করতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইইউ দ্রুত এ সমঝোতার বাস্তবায়ন দেখতে চায়। ইইউ ওই বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবে। তিনি অবিলম্বে মানবিক সহায়তাকর্মীদের রাখাইনে প্রবেশের সুযোগ দিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি রাখাইন রাজ্য বিষয়ক পরামর্শক কমিশনের সুপারিশগুলোও দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দেন। ‘লজ্জাজনক চুক্তি’ বললেন ব্রিটিশ অধ্যাপক : বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সমঝোতাকে ‘লজ্জাজনক চুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন যুক্তরাজ্যের রিডিং ইউনিভার্সিটির আইন, সংঘাত ও বৈশ্বিক উন্নয়ন বিষয়ক অধ্যাপক রোসা ফ্রিডম্যান। দ্য কনভারসেশন ডটকমে এক নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, ‘রোহিঙ্গাদের তাদের নিপীড়নকারীদের হাতে তুলে দেওয়া কেবল আন্তর্জাতিক আইনেরই লঙ্ঘন নয়, সবচেয়ে ঘৃণ্য অপরাধ ও নির্যাতনের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের সুরক্ষায় বিশ্বের দায়বদ্ধতা নিয়েও মৌলিক প্রশ্ন উঠবে। ’ বৃহস্পতিবারই এক টুইট বার্তায় অধ্যাপক রোসা ফ্রিডম্যান লেখেন, ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের সুরক্ষা নিশ্চিত না করেই তাদের ফিরিয়ে দিতে বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে একটি চুক্তিতে রাজি হয়েছে। স্রেব্রেনিচার বিষয়ে সারা বিশ্বের দৃষ্টি দেওয়ার পরদিনই এ ঘটনা ঘটল। এটি চল্লিশের দশকের শুরুর দিকে ইহুদিদের জার্মানিতে ফেরত পাঠানো চুক্তির অনুরূপ।

মানবাধিকার এর আরো খবর