সাধারণ পরিষদে উত্থাপিত প্রস্তাবে এ সপ্তাহেই ভোট
রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার জোর তাগিদ
খবরের অন্তরালে প্রতিবেদক :

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন, নাগরিকত্ব প্রদান, অনতিবিলম্বে তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ করাসহ মিয়ানমারের প্রতি ১৬টি সুনির্দিষ্ট আহ্বান জানিয়ে উত্থাপিত একটি প্রস্তাব বিবেচনা করছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। পরিষদের সামাজিক, মানবিক ও সংস্কৃতিবিষয়ক ফোরাম থার্ড কমিটিতে গত ৩১ অক্টোবর ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পক্ষে মিসর ‘মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতি’ শীর্ষক প্রস্তাবটি উত্থাপন করে। আগামী ১৬ নভেম্বর এ প্রস্তাবে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। প্রস্তাবটির পক্ষে বাংলাদেশ ব্যাপক কূটনৈতিক তত্পরতা চালাচ্ছে। ঢাকায় দূতাবাস নেই—এমন ৭৬টি দেশের নয়াদিল্লিভিত্তিক অনিবাসী রাষ্ট্রদূতদের গত শুক্রবার ব্রিফ করে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী রোহিঙ্গা ইস্যুতে সমর্থন চেয়েছেন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মতপার্থক্যের কারণে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এখনো কোনো প্রস্তাব গৃহীত না হওয়ায় সাধারণ পরিষদের থার্ড কমিটিতে উত্থাপিত প্রস্তাবটিকেই বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে উদ্যোগ প্রসঙ্গে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গত শুক্রবার রাতে নিউ ইয়র্কে সাংবাদিকদের বলেন, ‘নিরাপত্তা পরিষদের সীমাবদ্ধতার ব্যাপারে আমি অবশ্যই অবগত। এর পরও ওই পরিষদের সভাপতির বিবৃতি সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদেও বেশ কয়টি সদস্য রাষ্ট্র একটি প্রস্তাব এনেছে। আমরা এর ফলাফলের অপেক্ষায় আছি। ’ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা গণহত্যা প্রসঙ্গে গুতেরেস বলেন, ‘যা ঘটেছে তা ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। সহিংসতা ও ভয়াবহ নৃশংসতার যে মাত্রা তাতে আমরা নীরব থাকতে পারি না। ’ প্রস্তাবে যা আছে : কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, থার্ড কমিটিতে উত্থাপিত প্রস্তাবে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ, তাদের প্রত্যাবাসন ও নাগরিকত্ব দেওয়াসহ সব ধরনের নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রস্তাবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পাশাপাশি কাচিন ও শান রাজ্যে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় উদ্বেগ জানানো হয়েছে। এ ছাড়া রাখাইন রাজ্যে গত আগস্ট মাস থেকে সহিংসতায় ছয় লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়ায় এবং রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার বাহিনীর নির্বিচার বলপ্রয়োগের ঘটনায় সাধারণ পরিষদের চরম উৎকণ্ঠা স্থান পেয়েছে ওই প্রস্তাবে। প্রস্তাবে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে প্রতি ১৬টি সুনির্দিষ্ট আহ্বানের শুরুতেই আছে চলমান সামরিক অভিযান বন্ধ করে রোহিঙ্গাসহ অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর ধারাবাহিকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার প্রসঙ্গ। রাখাইন রাজ্যসহ মিয়ানমারের সংঘাতময় সব এলাকায় কোনো ধরনের বৈষম্য ছাড়া সবার জন্য মানবিক সহায়তা পাওয়া নিশ্চিত করতে দেশটির প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। খসড়া প্রস্তাবে পরিস্থিতির আরো অবনতি এবং আরো প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতি ঠেকাতে সবার কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মিয়ানমারে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত এবং দেশের বাইরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা সম্প্রদায়সহ সবার স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও সম্মানজনকভাবে নিজ বাসভূমিতে ফেরার বিষয়টি নিশ্চিত করতেও নেপিডোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। খসড়া প্রস্তাবে মিয়ানমারকে তার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য জাতিসংঘের সত্যানুসন্ধানী দল, মানবাধিকার পরিষদসহ সংশ্লিষ্টদের পূর্ণ, অবাধ ও নজরদারিবিহীন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের সব অভিযোগের পূর্ণ, স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানিয়ে মিয়ানমারকে বলা হয়েছে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে উগ্রবাদী মতবাদ ও বিভাজনের ভাবনা প্রচারকারীদেরও তদন্তের আওতায় আনার ব্যাপারে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। খসড়া প্রস্তাবে মিয়ানমারকে বলা হয়েছে, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি ও শরণার্থীদের পরিচয় যাচাই প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের সদস্যদের চলাফেরা, স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে তাদের মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতাকে সম্মান জানানো নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। রাখাইন রাজ্যবিষয়ক পরামর্শক কমিশনের (আনান কমিশনের) সুপারিশগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং সব সম্প্রদায়ের সম্প্রীতি নিশ্চিত করতে ওই রাজ্যের অর্থবহ উন্নয়ন করতে মিয়ানমারকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবে মিয়ানমারকে তার ১৯৮২ সালের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন পর্যালোচনাসহ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিক অধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। রোহিঙ্গা মুসলমানসহ অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বর্তমান সংকটের মূল কারণগুলো সমাধান করার তাগিদও খসড়া প্রস্তাবে স্থান পেয়েছে। ওআইসির পক্ষে মিসরের উত্থাপিত প্রস্তাবে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের দুর্দশায় উদ্বেগ জানানোর পাশাপাশি এ দেশের ভূমিকার প্রশংসা করা হয়েছে। সংকট সমাধান ও রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, দ্রুত ও নিরাপদে ফিরে যেতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সহযোগিতায় উৎসাহিত করার কথা স্থান পেয়েছে খসড়া প্রস্তাবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রতি এবং অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুতদের জন্য মানবিক সহায়তা দিয়ে মিয়ানমারের প্রতি সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যদিকে মিয়ানমারবিষয়ক আলোচনার উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে খসড়া প্রস্তাবে। এদিকে গত শুক্রবার রাতে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সাংবাদিকদের বলেন, ‘নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির বিবৃতি ও সাধারণ পরিষদে উত্থাপিত প্রস্তাব—দুটিতেই মহাসচিবকে এ বিষয়ে কিছু কাজ করার পরামর্শ বা অনুরোধ রয়েছে। আমি সেই পরামর্শ বা অনুরোধগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করব। কারণ এ বিষয়টি একক অপরিহার্য হিসেবে বিবেচনা করার প্রয়োজন আছে। ’ তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ হয়েছে—এ বিষয়টি নিশ্চিত করাই শুধু নয়, রাখাইন রাজ্য ও ওই অঞ্চলের উত্তরাংশের সব এলাকায় অবাধ মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের বিষয়েও আমাদের জোর দিতে হবে। ’ জাতিসংঘ মহাসচিব আরো বলেন, ‘পালিয়ে বাংলাদেশে আসা এবং অন্যত্র বাস্তুচ্যুত সব ব্যক্তির স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও সম্মানজনকভাবে ফিরে যাওয়ার অধিকারের ওপর আমাদের জোর দিতে হবে। ’ মূল সমস্যা হিসেবে তিনি রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বহীনতা ও রাষ্ট্রহীনতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে এগুলো সমাধানে সম্ভাব্য সব ক্ষেত্রে কাজ করার কথা জানান।

সর্বশেষ সংবাদ

মানবাধিকার এর আরো খবর