করোনা ভাইরাস: সর্বোচ্চ সতর্কতায় বাংলাদেশ

চীনের উহানে শুরু হওয়া করোনা ভাইরাসে এখন পর্যন্ত চার বিদেশিসহ ৯০৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। একইসঙ্গে আক্রান্তের সংখ্যা ৪১ হাজারের কাছাকাছি। যা অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। নতুন এ ভাইরাস প্রতিরোধে গত ৩ ফেব্রুয়ারি এক জরুরি বৈঠকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যেভাবেই হোক করোনাকে প্রতিরোধ করতে হবে বলে কঠোর বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী। সে আলোকেই স্বাস্থ্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগ করোনা ভাইরাস ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা নিয়ে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেশের সকল আন্তর্জাতিক চেকপোষ্টে প্রাথমিক সংক্রামক মেশিন বসানো হয়। একইসঙ্গে আকাশপথে প্রথম দিকে শুধু চীন ফেরত যাত্রীদের পরীক্ষা করেই দেশে ঢুকতে দেয়া হলেও পরে বিদেশ ফেরত প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ১২ হাজার যাত্রীকে পরীক্ষার আওতায় আনা হয়। তবে চীন ফেরত বর্তমান কাউকে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। সরকারের জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) দেয়া সূত্র অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৫৪ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। তাবে কারও মধ্যে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। ফলে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ নতুন এই ভাইরাসমুক্ত। যদিও এখনও দেশে এই নতুন করোনা ভাইরাসের পরীক্ষা পদ্ধতি সীমাবদ্ধ বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তারপরও ২০১৯-এনসিওভি প্রতিরোধে সকল প্রস্তুতি বাংলাদেশের রয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। অবশ্য, গতকাল রোববার সিঙ্গাপুরে প্রথমবারের মতো এক প্রবাসী বাংলাদেশি এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়ায় বিষয়টি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে আশার কথা হল, প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সংক্রমণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি দেশ বা অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে ভারত ও মিয়ানমার। এ তালিকায় নাম নেই বাংলাদেশের। সম্প্রতি জার্মানির হামবোল্ট ইউনিভার্সিটি ও রবার্ট কচ ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় এ তথ্য জানানো হয়েছে। উহান শহর থেকে ছড়ানো করোনাভাইরাস সংক্রমণের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে থাইল্যান্ড, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। থাইল্যান্ডে এ পর্যন্ত নতুন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৩২ জন। জাপানে আক্রান্ত হয়েছেন ৯০ জন; এদের মধ্যে ৬৪ জনই একটি প্রমোদতরীর। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন ২৫ জন। তারপরও সর্বোচ্চ সতর্কতায় বাংলাদেশ। কেননা, এখানকার আবহওয়া ও প্রকৃতির অবস্থা বিবেচনা করলে দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, করোনা টেস্টের ফলাফল আরও দ্রুত পেতে কিছু সিস্টেম তৈরি হয়েছে, সেগুলোও শিগগিরই বাংলাদেশে পৌঁছে যাবে। প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, উন্নত বিশ্বের যে দুই থেকে তিনটা দেশ ল্যাবরেটরি নমুনা পরীক্ষার পদ্ধতি বের করেছে তা কয়েকদিনের ভেতরে আমাদের দেশেও আসবে। তখন আর নমুনা পরীক্ষার ফলাফল পুরোপুরি নিশ্চিত হতে আর কোথাও পাঠাতে হবে না। আমরা নিশ্চিত করলেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সেটা মেনে নেবে। কারণ, আমাদের ল্যাব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। তবে ‘র‌্যাপিড টেস্টের’ জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে বাংলাদেশে কিছু চাহিদার কথা জানিয়েছে। কিন্তু সেগুলো এখনও দেশে না পৌঁছায়নি। আগামি কয়েকদিনের মধ্যে সেগুলো পাওয়া যাবে। করোনার ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ প্রস্তুত কিনা প্রশ্নে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ গণমাধ্যমকে জানান, ‘আমি মনে করি আমরা প্রস্তুত। কারণ, বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস চীনের মতো হবে-এটা আমরা মনে করি না। পৃথিবীতে সব দেশেরই এখন প্রস্তুতি রয়েছে। চীনে ঝুঁকিপূর্ণ যে এলাকা রয়েছে সেগুলো তারা ‘সিল’ করে দিয়েছে। প্রথম দিকে তাদের প্রস্তুতির ঘাটতি থাকলেও এখন সেটা শক্তিশালী হয়েছে। চীন থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বা আক্রান্ত যারা রয়েছেন তারা বাইরে বের হতে পারছেন না। একইসঙ্গে সারা পৃথিবীতে মানুষ যখন অন্য দেশে যাচ্ছে তখন সে দেশ থেকে বের হওয়ার আগেই সেখানে প্রথম স্ক্রিনিং হয়ে আসছে, সেখানেও কিন্তু প্রটেকশন আছে। আবার বাংলাদেশে যদি কেউ সেরকম অবস্থায় (আক্রান্ত হওয়ার পর) আসতে চায়, তাহলে তাদের শনাক্ত করে ফেলার মতো কৌশল বর্তমানে আছে আমাদের।’ তিনি বলেন, ‘কাউকে যদি সন্দেহভাজন মনে হয় তাহলে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হবে। পরীক্ষার প্রয়োজন হলে সেটা করা হবে, যেমনটা এখন করা হচ্ছে। যদি কেউ আক্রান্ত হয় তাহলে রোগ যেন ছড়াতে না পারে তার ব্যবস্থাও করা হবে। সেজন্য আমাদের সব ধরনের সামর্থ্য এবং প্রস্তুতি রয়েছে ‘ অপরদিকে আইইডিসিআর বলছে, করোনা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। এর সঙ্গে অনেক ধরনের হিসাব-নিকাশ আছে। তাই জ্বর-সর্দি-কাশি কিংবা শ্বাসকষ্ট হলেই চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার দরকার নেই। আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘চীন থেকে ফেরত আসা অনেকে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন। তারা রোগ শনাক্তকরণের জন্য বিভিন্ন হাসপাতালে যাচ্ছেন। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা হচ্ছে, চীনের সব প্রদেশে একইসঙ্গে করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট যাত্রীরা যদি উহানসহ চীনের অন্য এলাকা থেকে করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার ১৪ দিন আগে এসে থাকেন তাহলে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। আবার উহান থেকে আসার পর যদি ১৪ দিন অতিক্রান্ত হয়ে থাকে তাহলেও উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। চীন থেকে আসার ১৪ দিন পার হওয়ার আগে কারও মধ্যে যদি কোনও লক্ষণ দেখা যায় তাদেরই কেবল আইইডিসিআরের হটলাইনে যোগাযোগ করতে হবে।’ তিনি বলেন, আমরা আশা করি বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস সেভাবে ছড়াবে না। যদি অনেক বেশি কেস হয়ে যায়,তখন আর পরীক্ষার প্রয়োজনই হবে না। কারণ এটা কমন ফ্লু। এর কোনও বিশেষ চিকিৎসা নেই। আর এর পরীক্ষা পদ্ধতি শুধু বাংলাদেশ নয় পৃথিবীজুড়ে অপ্রতুল। আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর বলেন, বর্তমানে করোনা শনাক্তের জন্য নমুনা সংগ্রহ করার পর ফলাফলের জন্য ৪৮ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। আর কয়েকদিন পরই র‌্যাপিড টেস্টের সব ধরনের ফ্যাসিলিটিজ দেশে চলে আসবে। তখন আর ৪৮ ঘণ্টা নয়, ২৪ ঘণ্টাতেই নমুনা পরীক্ষার ফল জানা যাবে। এদিকে, করোনার মহামারিতে ভুগতে থাকা চীনে বসবাসরত ১৭১ বাংলাদেশি দেশে ফেরত আসতে চাইলেও বেইজিংয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় আপাতত তাদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। তবে তাদের খাদ্য ও অন্যান্য সহযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ দূতাবাস। চীনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আপাতত তাদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

স্বাস্থ্য এর আরো খবর