সোনলী আঁশের সোনালী অতীত ফিরে আসুক

সম্প্রতি এক সহযোগী প্রচারমাধ্যমে সোনালি আঁশের সোনালি অতীত ফিরে আসা নিয়ে যে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে, তাতে আমরা আশাবাদী।
বিশ্বজুড়ে পলিথিন, সিনথেটিক ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় দিন দিন নিস্তেজ হতে থাকে পাটশিল্প।পরিবেশ প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তবে করোনা মহামারীকালে পাটজাত পণ্যের কদর  বাড়ছে বিশ্ববাসী। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানি বেড়ে চলেছে। দেশীয় বাজারেও কাঁচা পাটের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। হাসি ফুটেছে চাষিদের মুখে। রপ্তানির ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে নীতিসহায়তা পেলে সোনালি আঁশের সোনালি অতীত ফিরে আসবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছেন ।
বালাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর  তথ্যে দেখা যায়, রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে বর্তমানে পোশাক খাতের পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পাট খাত। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের (জুলাই-আগস্ট) এই দুই মাসে পাট ও পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে ১৯ কোটি ৫৪ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫০% বেশি।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ১৫ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ের চেয়ে এ খাতের আয় কমেছে ১৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ। অন্যদিকে এই দুই মাসে পাট ও পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ১৯ কোটি ৫৪ লাখ ডলার; প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ। করোনা ভাইরাসের কারণে গেল অর্থবছরে তৈরি পোশাকসহ বড় সব খাতের রপ্তানি আয়ে ধস নামলেও পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আয়ে বরাবরই দেখা গেছে উল্টো চিত্র।
করোনা ভাইরাসের কারণে পুরো বিশ্ব এখন পাটের ওপর ঝুঁকছে। পাট পণ্যের ব্যবহার হু হু করে বাড়ায় রপ্তানিও বাড়ছে। এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে সরকারের নীতি সহায়তা প্রয়োজন।  দেশীয় পাটকলের চাহিদার তুলনায় প্রায় ১০ লাখ বেল উৎপাদন কম হয়েছে। বাজারে পাটের সংকট চলায় দাম বেড়েছে কয়েকগুণ।এর পরে টাকা দিয়েও পাট পাওয়া যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। দেশীয় পাটকল বাঁচাতে হলে কাঁচাপাট রপ্তানি বন্ধ করতে হবে।
পাটশিল্পের ভবিষ্যৎ  ভালোর দিকে । নীতি সহায়তা পেলে এ শিল্প আবারও সোনালি অতীত ফিরে আসবে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য ম,তে, ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ ৬৮৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার আয় করেছে। এর মধ্যে ১৯ কোটি ৫৪ লাখ হাজার ডলার এসেছে পাট ও পাট পণ্য রপ্তানি থেকে ।
এই দুই মাসে জুট ইয়ার্ন রপ্তানি হয়েছে ১৪ কোটি ১৬ লাখ ৩০ হাজার ডলারের। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬৭ %। কাঁচা পাট রপ্তানি হয়েছে ১ কোটি ৯৭ লাখ ৪০ হাজার ডলার। আয় বেড়েছে ৩৭ দশমিক ৯৫ %।
পাটের তৈরি বস্তা, চট ও থলে রপ্তানি হয়েছে ২ কোটি ৭ লাখ ৪০ হাজার ডলারের। আয় বেড়েছে ৩৩.৮৯ %। পাট ও পাট সুতা দিয়ে হাতে তৈরি বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ২ কোটি ২২ লাখ ৩০ হাজার ডলার। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৩.৭১ %। এ ছাড়া পাটের তৈরি অন্যান্য পণ্য রপ্তানি হয়েছে ১ কোটি ৩২ লাখ ৮০ হাজার ডলারের।
গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ মোট ৮৮ কোটি ২৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার আয় করেছিল, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরের চেয়ে ৮ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় বেশি এসেছিল ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরে পাটসুতা রপ্তানি থেকে ৫৬ কোটি ৪৬ লাখ ডলার আয় হয়েছিল। অর্থাৎ মোট রপ্তানি ৬৪ শতাংশই এসেছিল পাটসুতা রপ্তানি থেকে। কাঁচাপাট রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ১৩ কোটি ডলার। পাটের তৈরি বস্তা, চট ও থলে রপ্তানি হয়েছিল ১০ কোটি ৬৫ লাখ ডলারের। ২০২০-২১ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১১৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, দেশে সাড়ে সাত থেকে আট লাখ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়। যেখানে কম বেশি ৮০ লাখ বেল পাটের আঁশ উৎপন্ন হয়ে থাকে। দেশের সব জেলাতেই কম-বেশি পাটের চাষ হয়। তবে সবচেয়ে বেশি পাটের চাষ হয় ফরিদপুর জেলায়, সেখানে এবার ৮৪ হাজার হেক্টর জমিতে পাটের চাষ হয়েছে। গত মৌসুমে হয়েছিল ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে।
পাট পণ্যের মূল্য নির্ধারণ হয় কাঁচা পাটের ক্রয় মূল্যের ওপর। পাট পণ্যের প্রায় ৭৫ শতাশ কাঁচা পাট কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাই পাটজাতপণ্য উৎপাদনে পাট উৎপাদনের পাশাপাশি কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ করতে হবে।
কাঁচা মালেরর সংকট দেখা দিলে এর মূল্য অতিমাত্রায় বেড়ে যাবে। এর সাথে সাথে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। 
কাঁচা পাট সরবরাহে ঘাটতির কারণে পাটকল বন্ধ হয়ে গেলে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারের ক্রেতারা পাটপণ্য ব্যবহার থেকে সরে দাঁড়াবে। তাই এবিষয়ে এখনি সরকারের হস্তক্ষেপ জরুরী হয়ে পড়েছে।
আমরা আশাবাদী বিশ্বজুড়ে মানুষদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। পলিথিন জাতীয় পরিবেশ ধ্বংশকারী সামগ্রী থেকে মানুষ মূখ ফিরিয়ে নেবে এবং বাংলাদেশের সোনলী আঁশ আবার তার সোনালী অতীত ফিরে পাবে।

সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয় এর আরো খবর