‘৮ই ফাল্গুন রাষ্ট্র-ভাষা দিবস’ ঘোষণা করুন

বাংলা ভাষা আন্দোলন ছিল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) সংঘটিত একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন। মৌলিক অধিকার রক্ষাকল্পে বাংলা ভাষাকে ঘিরে সৃষ্ট এ আন্দোলনের মাধ্যমে তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণ-দাবীর বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
৮ই ফাল্গুন ১৩৫৮-তে এ আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করলেও বস্তুত এর বীজ বপিত হয়েছিল বহু আগে। অন্যদিকে এর প্রতিক্রিয়া এবং ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্বের ভিত্তিতে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তানের উদ্ভব হয়। কিন্তু পাকিস্তানের দু’টি অংশ- পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক ও ভাষাগত দিক থেকে অনেক মৌলিক পার্থক্য বিরাজ করছিল। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করে যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এ ঘোষণার প্রেক্ষাপটে পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানকারী বাংলাভাষী সাধারণ জনগণের মধ্যে গভীর ক্ষোভের জন্ম হয় ও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। কার্যতঃ পূর্ব পাকিস্তান অংশের বাংলাভাষী মানুষ আকস্মিক ও অন্যায্য এ সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারেনি এবং মানসিকভাবে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। ফলস্বরূপ বাংলাভাষার সম-মর্যাদার দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন দ্রুত দানা বেঁধে ওঠে।
আন্দোলন দমনে পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে ঢাকা শহরে সমাবেশ-মিছিল ইত্যাদি বে-আইনী ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ৮ ফাল্গুন ১৩৫৮(১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি) এ আদেশ অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু সংখ্যক ছাত্র ও প্রগতিশীল কিছু রাজনৈতিক কর্মী মিলে মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশ ১৪৪ ধারা অবমাননার অজুহাতে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। গুলিতে নিহত হন রফিক, সালাম, বরকত-সহ আরও অনেকে। শহীদদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়ে ওঠে। শোকাবহ এ ঘটনার অভিঘাতে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ক্রমবর্ধমান গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং ১৯৫৬ সালে সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি প্রদান করে।
১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো বাংলা ভাষা আন্দোলন, মানুষের ভাষা এবং কৃষ্টির অধিকারের প্রতি সম্মান জানিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। যা বৈশ্বিক পর্যায়ে গভীর শ্রদ্ধা ও যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে উদযাপন করা হয়। যে বাংলা ভাষার জন্য আমাদের ভাষা সংগ্রামীরা প্রাণ দিয়েছেন, শহীদ হয়েছেন- সেই ভাষার প্রতি সম্মান জানাতে বাংলা সনের ‘৮ই ফাল্গুন’কে রাষ্ট্র-ভাষা দিবস হিসেবে এবং বাংলাভাষাকে আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
যে বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকারের জন্য ১৩৫৮ সালের এই ৮ই ফাল্গুন সালাম, বরকত, জব্বার প্রমূখ শহীদগণ বুকের রক্ত দিয়েছেন তাদের এই আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য ‘৮ই ফাল্গুন রাষ্ট্র-ভাষা দিবস’ ঘোষণা করতে আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। আমার মাটির ভাষা, মায়ের ভাষা বাংলাকে আমি ইংরেজি মাসের তারিখ দিয়ে স্মরণ করতে চাইনা। আমি ২১শে ফেব্রুয়ারিকে মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ভুলে যেতে চাই। কারণ ফেব্রুয়ারি আমার ফাল্গুনকে ভুলিয়ে দিয়েছে! স্মরণে আসতে দেয় নাই।
২১শে ফেব্রুয়ারিকে স্মরণ করতে চাই ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। ৮ই ফাল্গুনে রাষ্ট্র-ভাষা আন্দোলনের সকল সহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।
প্রকাশক ও সম্পাদক

সর্বশেষ সংবাদ